Sunday, December 3, 2017

।| অদ্যই শেষ রজনী ।।




বিশেষ একটি কাজে পুরোনো কিছু ছবি ঘাঁটাঘাঁটির প্রয়োজন পড়েছিলো। ছেলেবেলার স্মৃতি দিয়ে তৈরী আমার রাজপ্রাসাদের ভিত্তি মনে হয় এখনো বেশ মজবুত। ভিত্তিপ্রস্থ কবে প্রথম স্থাপন হয়েছিল তা মনে নেই কিন্তু সেই রাজপ্রাসাদের সোনালী জানলা দিয়ে শীত গ্রীস্ম বর্ষা জুড়ে বসন্তের রঙিন তরতাজা হাওয়ার য়ার আনাগোনা বিদেশের প্রাণহীন দিনযাপনে আমার নিত্যসঙ্গী ! ছবির বাক্সে হাত দিতে আবার নতুন করে মনে পড়ে গেল স্কুলে শেখা প্রবাদবাক্য A picture is worth a thousand words ! সারা সপ্তাহের অফিসের ক্লান্তি আর একঘেঁয়েমি কিছুটা বিদেয় করলাম। এক কোল ছবি নিয়ে আলাদিনের যাদুর গালিচায় চেপে কিছুক্ষণের জন্য দেশের বাড়ি নবদ্বীপে ঘুর ঘুর করে এলাম। আমাদের ছোটপিসির একটা অতি বাস্তব কথা আমাদের ভাই বোনেদের একে অপরকে  জড়িয়ে থাকার বাঁধনটা আরো শক্ত করে। নবদ্বীপে আমাদের জমায়েতের শেষ রাত্তিরে ছোটোপিসি অবশ্যই মনে করিয়ে দেয় যত পারো আনন্দ কর কারণ "অদ্যই শেষ রজনী" আর তখনই নতুন করে কেমন শোক উথলে ওঠে, রাগ হয় ঘোড়া নামক ঘড়ির ওপর। ইশ সত্যি তো কোথা দিয়ে ছুটি শেষ হয়ে গেলো টেরই পেলাম না, কত কিছু করার ছিল, কত গল্প বলার ছিল ,কত কথা শোনার ছিল, কিন্তু কই তার সিকি ভাগও তো হোলোনা ! ঝড়ের বেগে শেষ রাত এসে হাজির। আমাদের বাড়ির পেছন দিকে গ্রিলের গেট ছাড়িয়ে ঢালা বারান্দা পেড়িয়ে কুয়োতলায় গিয়ে তবে হাত ধুতে হত ছোটবেলায়। ঝকঝকে দিনের আলো আর ঘুটঘুটে রাতের অন্ধকারে বারান্দা আর কুয়োতলার রূপ একদম বিপরীত। প্রকান্ড প্রকান্ড গাছ দিয়ে ঘেরা সেই দালান পেড়োতে রাত্রি বেলা রীতিমত সাহসীকতার পরিচয় দেবার প্রতিযোগিতা শুরু হত আমাদের মধ্যে। আমাদের একতলা বাড়ির পাশেই মস্ত তিন না চার তলার চিত্তদার বাড়ি। দালান থেকে মাথা তুললেই চিত্তদার বাড়ি দেখা যায়। এই চিত্তদা আদপেও আমাদের দাদার বয়সী না কিন্তু দু প্রজন্ম ধরেই উনি চিত্তদা নামেই পরিচিত। আমি ওনাকে কখনো চোখে দেখিনি কিন্তু ওনার প্রকান্ড বাড়ির চিলেকোঠায় মহা আনন্দে মা লক্ষীর বাহনেরা বসবাস করেন সেই গপ্প বহুবার শুনেছি। রাতের বেলায় কুয়োতলায় যেতে গেলে হয় চোখ বন্ধ রাখতাম নাহয় প্রাণপনে ছুট লাগাতাম পাছে চিত্তদার বাড়ির চিলেকোঠার দিকে চোখ যায় । কিন্তু বাড়িতে ঢুকেই আবার বীরবিক্রমে চিত্তদার চিলেকোঠায় চোখ রাখতাম,দেখতাম আমাদের প্রকান্ড কালো আমগাছের পাতার ফাঁকে চাঁদের  রুপোলি আলোর রেখা থেকে স্বপ্নিল  আভা বেরোচ্ছে আর সেই জোৎস্নার আভা ভেদ করে পেঁচা আর পেঁচানির খাশা দরবারি রাগ ভেসে আসছে।ওটা শুনতে শুনতে কখন চোখ লেগে যেত. মজার ব্যাপার হলো ছুটির শেষদিন থুড়ি শেষ রাতে ছোটোপিসির অদ্যই শেষ রজনী শুনলে কুয়োপাড়ে যেতে আর ভয় পেতাম না, চিলেকোঠায় তাকাতেওনা। ভয় কে জয় করতে জুড়ি নেই ছোটোপিসির। আমরাও তখন আসল মন্ত্র জানি, তখন একটাই চিন্তা আনন্দের শেষ বিন্দুটা নিংড়ে নিতে হবে , কাল থেকে কঠিন কঠোর বাস্তবে পা রাখব। ..

আমার বোন গার্গীর বিয়ের দিন সকাল বেলা আমাদের বাগানে জমায়েতের ছবি। পেছনে চিত্তদার বাড়ির  একঝলক। 



No comments:

Post a Comment