Sunday, December 3, 2017

।। ছায়ার অ্যালবাম ।।


ভিভালদির Four Seasons শুনছিলাম আজ সন্ধ্যেবেলা। ভায়োলিন কনসার্টকে মাধ্যম করে প্রকৃতির চারটি রূপ যে এমন সুন্দরভাবে সুরের জালে বন্দি করা যায় তা এমন মহান শিল্পীদের কর্মকান্ডের সাথে পরিচিত না হলে অজানা থেকে যেত। Music এ আমার সীমিত জ্ঞান এর সাথে কল্পনা যখন মনের আয়নায় ঘুরে ঘুরে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে আল্পনা আঁকছে,বাজনার তালে তালে দেখতে পেলাম বসন্তের ভোরে কোকিলের একটানা ডাকে গাছের রং কখন পান্না সবুজে পরিণত, কখনও গ্রীষ্মের দারুণ অগ্নিবাণে রিক্ত ধরণীর কঠিন ব্রতপালন, কখনও হেমন্ত ঘন সাদা কুয়াশার চাদর গায়ে জড়িয়ে শস্যক্ষেতে বর্ষশেষে সামিল হচ্ছে কৃষককুলের আনুষ্ঠানিক পর্যায় আবার কখনো বৃদ্ধ শীত ঘোষণা করছে পুরাতনের সাথে নবীনের আলাপচারিতার বিষয়বস্তু । ... Four Seasons শুনছিলাম যখন তখন বাইরে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। আমাদের বারান্দার সামনে একটা প্রকান্ড গাছ। ওই গাছটিকে কেন্দ্র করে প্রকৃতির রূপ পরিবর্তন লক্ষ্য করতে বেশ ভালো লাগে। এই মুহূর্তে হেমন্তলক্ষী ওই গাছটিতে আশ্রয় নিয়েছেন। এ দৃশ্য ভারী পরিচিত, চাকার মতো ঘুরে ঘুরে আসে প্রতি বছর। ঘরের কোণে ভায়োলিনের তালে তালে মোমের শিখার ওঠা নামা দেওয়ালে সৃষ্টি করল রহস্যময় এক মায়াজালের। শব্দ আর আলোর মেলবন্ধনে জালের দৈর্ঘ্য বেড়ে বেড়ে ঘরের সিলিং ছুঁলো। মনে পড়ল ছোটবেলায় বড়পিসীদের বালিগঞ্জের বাড়িতে একবার পিসেমশাই মেমরি গেমের আসর বসিয়েছিলেন। আমরা অনুরোধ করলে "যাও পড়তে বস" শুনতে হতো বাবা কাকাদের কাছে । কিন্তু বড়পিসেমশাই একবার ইচ্ছে প্রকাশ করতেই গোটা মুখুজ্যে বাড়ি হাজির হয়েছিল মেমরি গেমের আসরে যোগ দিতে। সন্ধ্যেবেলায় বসেছিল সেই আসর। লোডশেডিং হয়েছিল তাই ঘরের কোণে বড় বড় মোমবাতি জ্বালানো হয়েছিল। মেমরি গেম পর্ব চলেছিল বহুক্ষণ কারণ কারোর ফাঁকি দেবার হুকুম ছিলনা। শেষ পর্যন্ত থেকে গেছিলাম আমি আর আমার জেঠতুতো দাদা বাকি সবাই আউট ! মোমের আলোয় পরিবারের সবার আশ্চর্য সুন্দর ছায়া পড়ছিল মতিলাল নেহেরু রোডের বিশাল বৈঠকখানার দেওয়ালে । ঠিক যেন দেওয়ালের গায়ে ছায়া দিয়ে ফ্যামিলি অ্যালবাম তৈরী করেছেন আমার পিসেমশাই। বেশ কয়েক রাউন্ড খেলা চলার পর একটা নেশা ধরে গেছিলো, দেওয়ালের ছায়ার দিকে তাকিয়ে গলার আওয়াজ শুনে বুঝতে চেষ্টা করব এটা কার গলা, যেন একটা নীল স্বপ্নের মধ্যে আলো আঁধারিতে নিজের মানুষগুলোকে ছুঁতে পাড়ার সহজ পাঠ নিচ্ছি । এবং হলো ঠিক তাই ,মনে হলো চোখ বন্ধ করলেই সবাইকে চিনতে পারবো। আমার বড়পিসেমশাই মানুষটা ছিলেন খুব সম্ভ্রান্ত। কেমন যেন একটা সাহেব সাহেব ব্যাপার ছিল। অসম্ভব ডিসিপ্লিনড। সবাইকে এক সূত্রে বেঁধে রাখার কি চমৎকার পাঠ পড়েছিলাম সেদিন পিসেমশাই এর কাছে। একটা মেমরি গেমকে কেন্দ্রকরে একটা আলো আঁধারির অরবিটের মধ্যে সবাই সবার পাশাপাশি বসে একে অপরকে মনে দিয়ে শুনছে ও মনে রাখার চেষ্টা করছে প্রানপনে। এ পাঠ তো কোনোদিন ভোলার না। আজকের সন্ধ্যের এই আলো আঁধারির স্বপ্নময় মুহূর্ত আমার খুব চেনা, আজ থেকে কিছু বছর আগের মোমের আলোর নকশার সাথে কি ভীষণ মিল তার। খালি দুঃখ একটাই যিনি সেদিন সহজ পাঠ পড়িয়েছিলেন তিনি চিরবিদায় নিয়েছেন আজ বহুবছর। আজ ভিভালদির সুর আর দেওয়ালে আলোর আল্পনায় নতুন করে জীবন্ত হলেন তিনি।
বরপিসেমশাই ও বড়পিসির ছবিটি আমার মেজো জেঠির সংগ্রহ থেকে।




No comments:

Post a Comment