এটা আমার ২০১৭ সালের শেষ পোস্ট। এমন কিছু দিয়ে লেখা শেষ করতে ইচ্ছে করলো যেটা বেশ চোখের সাথে সাথে মনের আরামের ব্যবস্থা করে। যাকে বলে মধুর সমাপ্তি । এই মুহূর্তে আসন্ন অনুয়াল ভ্যাকেশনে দেশে যাবার আনন্দে হার হিম করা বরফে চাপা পড়া গোটা স্কেনেক্টেদী শহরকেও মনে হচ্ছে রূপকথার রাজ্য। যদিও বরফের থেকে বিরক্তিকর জিনিস পৃথিবীতে আর আছে কিনা জানা নেই , তার কারণ প্রধানত কয়েকটি - ১.গৃহবন্দী হওয়া নিশ্চিন্ত ২.আছাড় খেয়ে পরে হাত পা ভাঙেনি এরকম লোকের দেখা পেলে ভাগ্যবান মনে করবো নিজেকে এবং সেরকম লোকের সাথে কথা হলেই এসময় রাস্তায় বেরোনোটা বেশ চাপের মনে হয় ৩. ঠান্ডা যে কতটা ভয়ানক হতে পারে একবার বরফের মাঝে দাঁড়ালেই টের পাওয়া যাবে। জোর দিয়ে বলতে পারি বাঙালিদের উইন্টার ওয়াড্রোবের অবিচ্ছেদ অঙ্গ মাংকি টুপিও হার মেনে যাবে এই শীতে। সেখানে মাধুরী দীক্ষিতের পক্ষে শিফন শাড়ি পরে নাচা যে কতটা অবাস্তব তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। তাই এরকম বন্দি দশায় বাড়িতে বসে হয় ভালো ভালো খাবার বানিয়ে খাও, না হয় খাদ্য চর্চা করো, সেইটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
নন্দিতা-শিবপ্রসাদের ছবি পোস্ত মুক্তি পাবার অন্তত ৭ মাস পর আমার ছবিটা দেখার সুযোগ হয়েছে। ২০১৭র ডিসেম্বরে। ঠাকুরদা ঠাকুমার আদরের নাতির ডাক নাম পোস্ত। সে আবার শান্তিনিকেতনে ঠাকুরদা ঠাকুমার সাথে থেকে আশ্রমের রীতি নীতি মেনে বড় হচ্ছে।এযুগের "ইয়ো বেবি" বাঙালি জেনেরেশনের ছেলে মেয়েদের ভালো নাম বা ডাকনাম যেখানে বেশিরভাগই অর্থহীন সেখানে পোস্ত নামটা বেশ আরামদায়ক কানের পক্ষে। শুধু কান কেন? পেট, মাথা এবং রসনার পক্ষে তো বটেই। বাঙালি নামটার সাথে পোস্ত নামটা অঙ্গাঙ্গি ভাবি জড়িত। কাঁচা পোস্ত বেটে ভাতে মেখে খাও বা বাটার মধ্যে আঙ্গুল ডুবিয়ে আঙ্গুল সোজা মুখে চালান করে দিয়ে চেটে খাও, তরকারি বানিয়ে খাও বা বড়া বানিয়ে, গরম ভাতের সাথে বা পান্তা ভাতের সাথে, পোস্ত ইন এনি ফর্ম ইস গডস ফুড। পোস্ত খেতে খেতে মাথার জোট গুলো কেমন যেন ছেড়ে যায়। মনে হয় বহুযুগের জং ধরা তালা গুলো কে যেন চাবি দিয়ে একটু একটু করে খুলতে খুলতে এগোচ্ছে। মাথার ভেতর লেয়ারে লেয়ারে জমে থাকা ঘুমের বাসনা গুলো জেগে উঠছে। শেষ তালা খোলা মাত্রই নীল রঙের রথে চেপে স্বর্গে পৌঁছে পারিজাতের গাছে পা ঝুলিয়ে বসে বেঙ্গমা বেঙ্গমীর গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়া। আমার কথা শুনে মনে হতে পারে আমি হয়তো পোস্ত খেয়ে নেশা টেশা করি। আমাদের এক সাউথ ইন্ডিয়ান কলিগের সেইরকম ধারণা হয়েছিল কলম্বাস এ ইন্ডিয়ান স্টোরে আমাদের হামলে পরে পোস্তর প্যাকেট কেনা দেখে। কিন্তু সত্যি বলছি যারা রোববার দুপুরে পাঁঠার মাংসের বদলে বিউলির ডালের সাথে আলুপোস্ত মেখে এক থালা ভাত খান তারা আমার কথার তারিফ করবেন আর বলবেন সত্যি তারা পারিজাতের গাছে চড়েন কিনা!
নন্দিতা-শিবপ্রসাদের ছবির প্রেক্ষাপট শান্তিনিকেতন। মনে পড়ল ২০০৮ সালে শান্তিনিকেতনে বেড়াতে গিয়ে পোস্ত খেয়েছিলাম। আশ্রমের ক্যান্টিনে। অকপট স্বীকারোক্তি - জীবনে সেই প্রথম পোস্ত খেতে একটুও ভালো লাগেনি। মনে হয়েছিল গামছা পরে বাটির মধ্যে নেমে সাঁতার কেটে পোস্ত আর আলু খুঁজে বের করতে হবে। ঝোলের প্লাবনে বাতি উপচে পড়ছে কিন্তু পোস্ত নিখোঁজ। আরো কিছু বছর আগে আমাদের নৈনিতাল ভ্রমণে পোস্তর একটা ছোট ভূমিকা ছিল। বাবা সব জায়গার মতো নৈনীতালেও বাঙালি রেস্তোরাঁ খুঁজে বের করেছিলেন - হোটেল মৌচাক। নৈনিতালের শেষদিন লাঞ্চ মেনুতে হোটেলের ম্যানেজার আমাদের জন্য বিশেষ ফেয়ারওয়েল স্পেশাল পোস্তর ব্যবস্থা করেছিলেন। লুডোর ছক্কার মতো ছোট ছোট করে কাটা আলু, কালোজিরে ফোড়ন দিয়ে সর্ষের তেল দিয়ে বেশ শুকনো শুকনো পোস্ত। বোন পোস্তর বাটিটা পাশে সরিয়ে রেখেছিলো সব শেষে তাড়িয়ে তাড়িয়ে খাবে বলে কিন্তু সেটা আর খাওয়া হয়ে ওঠেনি বেচারির কারণ আমাদের কাঠগোদাম যাবার বাস ছাড়ার টাইম হয়ে গেছিলো আর বাবা এক সেকেন্ডও এক্সট্রা সময় দিতে রাজি ছিলেন না। বাবার সাময়িক সান্ত্বনা শুনে গোমড়া মুখে পোস্তর দিকে আড় চোখ বুলিয়ে বোম মেরে বোন কাঠগোদামের বাসে চেপে বসল। বেড়ানো শেষে কলকাতায় ফিরে মা প্রথম যে রান্নাটা করেছিলেন সেটা হলো কালো জীরে ফোড়ন দেওয়া শুকনো শুকনো আলু পোস্ত। যে পোস্ত খেলে নীল রথে চড়ে বেঙ্গমা বেঙ্গমীর গান শুনতে পাওয়া যায় সেই পোস্ত। মৌচাক হোটেলের পোস্ত না খেতে পাবার শোক তো উধাও হলোই তার সাথে মার্ হাতের পোস্ত আমাদের ফেভারিট ফুড তালিকার একদম ওপরে স্থান করে নিলো। জীবনে অনেক জাতের পোস্ত খেয়েছি যেমন পেঁয়াজ পোস্ত ,আলু ঝিঙে পোস্ত, ডিম পোস্ত, সিম পোস্ত ,চিচিঙ্গা পোস্ত ,ঢ্যাঁড়স পোস্ত ,আলু ফুলকপি পোস্ত, বিন্স পোস্ত কিন্তু মার্ হাতের শুকনো আলুপোস্তর ধারে কাছে কোনোটাই পৌঁছয়নি। আমার বড় পিসেমশাই বাঙালদের রান্নার খুব সুখ্যাতি করতেন আর বিশেষ করে তারিফ করতেন মার তৈরী শুকনো আলু পোস্তর। একবার আমাদের বাড়ি এসেছিলেন হঠাৎ করে আগে থেকে খবর না দিয়ে শুধু সতীর হাতে আলুপোস্ত আর বিউলির ডাল খাবেন বলে। আমার বড়মামা আবার রুটি দিয়ে বেশ উপভোগ করে এই শুকনো পোস্ত। যাদের নাম করলাম তারা প্রত্যেকেই খাদ্য রসিক এবং নিখুঁত ক্রিটিক। তাই আমার মতো চুনোপুঁটির মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন যে শুকনো আলু পোস্তর স্বাদ কেমন! খালি এটুকু জানি আমেরিকায় থেকে প্লেন যখন টেক অফ করে তখন থেকে স্বপ্ন দেখি বাড়ি বসে কখন মার্ হাতের শুকনো পোস্ত উইথ বিউলির ডাল খাবো আর মাথার তালা খুলে নীল রথে চড়বো।

















































