এযাবৎ জীবনে যতবার শুক্ত খেয়েছি, মার হাতে তৈরী শুক্তোর ধারে কাছে কোনোটাই মনে হয়নি। তেতো হলেও এই খাবারটা আমার বড় প্রিয়। ছোটবেলায় নেমন্তন্ন বাড়ি গেলে আর মেনুতে শুক্ত থাকলে সেই বাড়ি সম্পর্কে একটা অজানা ভা লোবাসা জন্মে যেত আমার। প্রথমবার পরিবেশনের পর ক্যাটেরার যখন দ্বিতীয়বার ঝটিকা পরিবেশন করতে এগিয়ে আসতো, লজ্জা পেলেও গোটা কতক বড়ি চেয়ে খেতাম শুক্ত থেকে।
এহেন শুক্ত নিয়ে কিছু মজার ব্যাপার লক্ষ্য করেছি -
১. শুক্ত দিয়ে এক থালা ভাত খেয়ে নেওয়া যায়, তেতো হলেও তা খেতে অমৃত
২. শুক্ত দুর্দান্ত অপেটাইজার
৩. আমি লক্ষ্য করেছি যেকোনো বাঙালি বিয়েবাড়ি বা অনুষ্ঠান বাড়িতে এই পদটা দুপুরের মেনুতে থাকে, রাতের মেনুতে নয়, তার একটা সম্ভাব্য কারণ এটা ভাত দিয়ে খেতে হয়
৪. উচ্ছে থাকলেও একটা মিষ্টি স্বাদ থেকেই যায় আগাগোড়া
৫. শুক্ত কখনো হলুদ হয়না
ট্রাডিশনাল শুক্তোর রেসিপি না হয় পরে একদিন লিখবো। আমেরিকায় তো অনেক নতুন নতুন রান্না শিখলাম। এবার একটা নতুন রকমের শুক্ত ট্রাই করলাম। বাড়িতে বেশ কিছু শশা জমে গেছিলো যেগুলো এমনি কেটে বিটনুন দিয়ে খাওয়া ছাড়া আর উপায় মাথায় আসছিলোনা। কোথাও একটা ছবি চোখে পড়লো, শশার শুক্ত। বানিয়ে ফেললাম। তবে শুক্ত নাম হলেও খেতে তেতো না, বরং মিষ্টি!
বলে ফেলা যাক কিভাবে করেছি শশার শুক্ত।
উপকরণ :
বড় শশা -২ (আমি ছোট ছোট টুকরো করে কেটেছিলাম , গ্রেট করলে মনে হয় আরো ভালো হবে)
মুগ বড়ি - আমেরিকায় সব ইন্ডিয়ান দোকানে বড়ি পাওয়া যায়না। ভাগ্য ভালো তাই আলবানী তে পাওয়া গেছে
সর্ষের তেল - আন্দাজমতো
গোটা শর্ষে - ফোড়ন দিয়েছিলাম
শর্ষে বাটা - হাফ চা চামচ
পোস্ত বাটা - এক চা চামচ
আদা - ছোট ছোট কুচিকুচি করে কাটা
দুধ - পরিমান মত
ঘি - ছোট চামচের আধ চামচ এর বেশি খাবার ধৃষ্টতা দেখতে পারিনি
নুন- আন্দাজ মতো
চিনি - আন্দাজ মতো
প্রণালী :
আগে বড়ি ভেজে তুলে নিলাম একটা থালায়। তেল গরম হলে শর্ষে ফোড়ন দিয়ে আদাকুচি সামান্য ভেজে শশা গুলো দিয়ে দিলাম। নুন দিয়ে ঢাকা দিয়ে প্রায় ২০ মিনিট সেদ্ধ করলাম। সেদ্ধ না হলে আবার কিছুক্ষন ঢাকা। জল দেবার প্রয়োজন নেই কারণ শশার জলেই কড়াই ভেসে যাবে। সেদ্ধ পর্ব চুকলে সর্ষে বাটা, পোস্ত দিয়ে ভালো করে ভেজে ফেলা দরকার জলটা কমানোর জন্য। আয়তনে কমে এলে এর মধ্যে ভাজা বড়ি , অল্প দুধ,চিনি আর ঘি দিয়ে নেড়ে ঢেকে রাখলাম মিনিট ৬ এক। ঢাকনা খুলতেই ঘি এর গন্ধে রান্না ঘর ম ম ! দুধ আর সেদ্ধ শশার রস মিশে একটা ক্রিম গ্রেভি তৈরী হয়ে গেলো। গরম ভাত দিয়ে রাতের ডিনারে খেয়ে ফেললাম।
সত্যজিৎ রায়ের 'সমাপ্তি' ছায়াছবিতে মৃন্ময়ীকে তার (হবু) শাশুড়ি বিয়ের আগে ইন্টারভিউ নেবার সময় জিজ্ঞাসা করেছিলেন - "শুক্তনিতে কি ফোড়ন হয়" ? ছেলের পছন্দের কথা শুনে মা প্রায় অক্কা পেয়েছিলেন। প্রথম ধাক্কা সামলে মৃন্ময়ীকে ডেকে তিনি বেশ জরিপ করেছিলেন যে এ মেয়ে তাঁর ছেলের উপযুক্ত কিনা তাই বাঙালী মধ্যবিত্ত গেরস্তের ঘরে শুক্তোর ফোড়ন ছিল পরীক্ষায় ডিস্টিংকশন পেয়ে সফল ভাবে উত্তীর্ণ হবার মাপকাঠি । তবেই বোঝা যায় বাঙালি বাড়িতে শুক্তোর কি সাংঘাতিক ভূমিকা !
![]() |
| "ছেলের পছন্দের কথা শুনে মা প্রায় অক্কা পেলেন " সমাপ্তি ছায়াছবির দৃশ্য - ছবি সৌজন্য Google |
প্রথমবার শুনে ভেবেছিলাম শুক্ত শুনেছি, খেয়েওছি কিন্তু শুক্তনী নামটা তো জানতাম না। পরে জানলাম সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গ যাকে বলে শুক্তনী পূর্ববঙ্গ তাকে বলে শুক্তা। আর বইয়ে লেখা থাকে শুক্ত।
নিচে রইলো আমার তৈরি শশার শুক্তর কিছু ছবি।
![]() |
| Copyright Madhuja Mukhopadhyay |
![]() |
| Copyright Madhuja Mukhopadhyay |



No comments:
Post a Comment