ঘুঘনি খাবারটা খায়নি এমন বাঙালি হাতে গুণে বলা যাবে। এই মটর বিশিষ্ট 'খাশখাবার' এর কিছু রকমফেরকে কেন্দ্র করে একঝাঁক বহুচর্চিত গল্প আগে বলে ফেলি। তারপর না হয় ফুটবল ঘুঘনির বিবরণ দেব।
১. বিজয়ার ঘুঘনি - এ হল ছোটবেলার বিজয়ার স্মৃতি কারণ আজকের দিনে সেসব পাঠ চুকে গেছে । আগে দশমীর পর আত্মীয়দের বাড়ি ঘুরে ঘুরে বড়দের নমস্কার করতে যাবার পাব্বনি ছিল ঘুগনি । থালা ভর্তি চন্দ্রপুলি, রসগোল্লা, লাডডু, কুচো নিমকি, পেরাকি আর বাটিতে গরম ঘুগনি। ওপরে সদ্য কাটা পেঁয়াজ, কাঁচা লঙ্কা আর ধনেপাতা কুচি।
২. প্লাটফর্ম ঘুঘনি - লাল রঙের ঝোল, রেলওয়ে প্লাটফর্মের ধারে বিশাল এলুমিনিয়ামের ডেকচিতে রাখা। তলায় কেরোসিনের স্টোভে নিভু নিভু আঁচে গত বেশ কিছু দিন ধরে গরম হচ্ছে। শালপাতার বাটি করে কাঠের চামচ দিয়ে খেতে হবে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত বাঙালি পরিবারে অবশ্যই শেখানো হবে খাওয়া তো দুরস্ত ডেকচির দিকে দেখলেই অন্ধ হয়ে যাবে। তবুও খড়্গপুরের প্লাটফর্মে ট্রেন ঢুকতেই পুরি দিয়ে ঘুগনি খাবার বেলায় ছোটবেলায় শেখা "প্লাটফর্ম ঘুগনি ভীতি" কে গুলি মেরে কোনোদিকে না তাকিয়ে কোপাকপ পুরি দিয়ে ঘুঘনি খাও আর মাঝে মাঝে পায়ের দিকে দু চারটে মশার কামড় খেতে খেতে স্বাদ উপভোগ করে নিজেকে বল ইশ এতদিন কেন এই অমৃতের স্বাদ নিইনি । পরদিন সকালে যে ঘটনাটা অবধারিত ঘটবে সেটা না হয় উহ্য থাক।
৩. প্যান্ডেল ঘুগনি - পুজোর মাঠের ধুলো মাখা ময়লা হাতে যে ঘুগনি খেতে হয় তাকে বলে প্যান্ডেল ঘুগনি যেটা একা খাওয়া যায়না। পুজো বলে মনটা বেশ উদার থাকে তাই একটা বাটি থেকে কাঠের চামচ দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে সবাই মিলে খাওয়া যায় প্যান্ডেল ঘুগনি। আর সেই সবাই যদি কেবল কপোত কপোতি হলে তো কথাই নেই।
৪. অফিস পাড়ার ঘুগনি -বিকেলের চা আর ম্যানেজারের জ্ঞানের সাথে অফিসের গেটের বাইরের ঘুগনি হলো অফিস পাড়ার ঘুগনি । প্লাটফর্ম ঘুঘনির সাথে বিশেষ তফাৎ নেই তবে ঘুঘনীর বয়স খুব বেশিদিন না কারণ কর্পোরেট এমপ্লয়ীরা মা লক্ষী,তাঁদের বেশি পুরোনো খানা খাওয়ালে ব্যবস্যা লাটে উঠবে।
৫. ফুটবল ঘুঘনি - নামটা শুনে একটু অবাক লাগছে তো? এই ঘুগনি হলো "ষ্টার অফ দি শো"। ফুটবল ঘুঘনির জন্মের সময় আমরা অনেক ছোট। কোনো একটা বিশ্বকাপ ফুটবল সিসন চলছে। পরদিন স্কুল আছে বলে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছি। সেদিন বোধহয় মারকাটারি কিছু ম্যাচ ছিল। সম্ভবত সেমিফাইনাল টাইনাল কিছু হবে। রাত দুটো নাগাদ ঘুম ভেঙে গেলো প্রেসার কুকারের সিটিতে। মা খুব চিন্তিত হয়ে বাইরে সরোজমিনে তদন্ত করতে বেড়োলো কারণ ঘটনাটা অপ্রত্যাশিত এবং অসম্ভব ঘটনা। ভাঁড়ারে নিজে হাতে চাবি মেরেছে মা তাই প্রেসার কুকারের সিটি এখন স্বপ্নেই বাজা সম্ভব। তদন্তে আমরাও যোগদান করলাম। দেখা গেল বাবা রান্নাঘরে মহা মনোযোগ সহকারে ঘুঘনি রান্না করছে আর বাবাকে সঙ্গ দিচ্ছে টিভির ফুটবল ম্যাচ । মটর সেদ্ধর শব্দটা এতো জোরে হবে সেটা বাবা আগে থেকে আন্দাজ করেনি সেটা বিলক্ষণ টের পাওয়া গেলো। চমকে গেছি আমরা আর চমকে গেছে বাবা। অবশ্যই এটা ছিল আমাদের জন্য বাবার তরফ থেকে পরদিনের সারপ্রাইস টিফিন। কিন্তু রাট দুটোর সিটি আর সেটা সারপ্রাইস রাখেনি। বাটি চামচ নিয়ে টিভির সামনে একটুও সময় নষ্ট না করে আমরা বসে পড়লাম গরম গরম খাব বলে। ফুটবল ঘুঘনি সেই থেকে আমাদের বাড়ি খুব বিখ্যাত। বাবা নবদ্বীপ গেলে মুখুজ্যে বাড়ির ফুটবল ঘুঘনি ফ্যানেরা বাটি চামচ হাতে বসে পরে। এই ঘুগনি বানানোর জন্য বিশেষ দিনক্ষণ পঞ্জিকার প্রয়োজন নেই। যার প্রয়োজন সেগুলো হলো -
সাদা/সর্ষের তেল
গোটা জিরে
ধনে গুঁড়ো
জিরে গুঁড়ো
চানা মশলা
আদা বাটা
টমেটো কুচি
পেঁয়াজ কুচি
আলু ছোট করে কাটা
ফুলকপি ছোট করে কাটা
আন্দাজমতো নুন
গোলমরিচের গুঁড়ো
কড়াইতে তেল দিয়ে গোটা জিরে ফোড়ন দিতে হবে। ছোট করে কাটা আলু,ফুলকপি,পেঁয়াজ, টমেটো ভেজে নিতে হবে। ধনে গুঁড়ো, জিরে গুঁড়ো,চানা মশলা,আদা বাটা সাঁতলে নিতে হবে। আগে থেকে ভেজে রাখা সবজির সাথে মেশাতে হবে এই মশলা। সাঁতলানো হলে সেদ্ধ মটর মিশিয়ে দিতে হবে। শেষে নুন আর গোলমরিচের গুঁড়ো মিশিয়ে দিলেই তৈরি ফুটবল ঘুঘনি।
ঋতুপর্ণর ফার্স্ট পার্সন আর বাবার ফুটবল ঘুঘনি জমিয়ে দিল শীতের সন্ধ্যে।






No comments:
Post a Comment