সদ্য দুর্গাপুজো গেছে। আগেই বলেছি দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়েছি আমেরিকার দূর্গা পুজোতে। ইচ্ছে থাকলেও দেশে পুজোয় যাবার উপায় হয়নি এবার। কালী পুজোতেও জুটলো সেই ঘোল ! সকালে অফিস আর রাতে নস্টালজিয়া এই ছিল আমার ভূত চতুর্দশী ! আজ চোদ্দ প্রদীপ জ্বালাতে জ্বালাতে প্রদীপের শিখা থেকে হাতছানি দিচ্ছিলো চেনা কিছু মুখ,চেনা স্মৃতি , চেনা গল্প আর কিছু হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার মানুষের হাসি মুখের মিছিল ।
ছোটবেলার ভূত চতুর্দশীর স্মৃতি মানেই মাসির কাছে ভর সন্ধ্যেবেলা ভূতের গপ্পো শোনা ! অলিতে গলিতে তখন কালীপুজোর কালিপটকা দোদোমা তুবড়ি ফাটছে ,পাড়ার সব বাড়ির জানলা বা বারান্দা সেজে উঠেছে তেল বা ঘি এর চোদ্দ প্রদীপ দিয়ে। কেউ কেউ আবার অতি উৎসাহী হয়ে সেই প্রদীপের আলোতেই সদ্য জ্বালানো যত্নের ফুলঝুরির সোনালী তারাগুলি মুঠো ভোরে জড়ো করছে যেন অন্ধকারে খুঁজে পাওয়া অরূপরতন । আমরা মাসতুতো ভাই বোনেরা ভাইফোঁটা উপলক্ষে জমায়েত হচ্ছি। মাসিকে ঘিরে বসেছি ভূত চতুর্দশীর গপ্পো শুনবো বলে। গল্পটা ছিল কুনি (ঘরের কোণের পেত্নী ) আর বুনির (বাড়ির বাইরের গাছের পেত্নী ) গল্প। গল্পে শুরু থেকে শেষ অনেক অন্তমিল ছড়া ছিল যেমন -
"হ্যাডেলে বামুন হ্যালেঞ্চ ,
কাঠি দিয়ে দাঁত ছলঞ্চ।
কুনিকে বলবি বুনির ছেলে হয়েছে ".
অপরিষ্কার বামুনকে বুনি ভূতের জানান দেওয়া যে তার ঘরে কুনি ভূত আছে অতএব সত্বর বাড়ি ঘর পরিষ্কার কর নয়তো পেত্নী ঘর মটকে দেবে !
গল্পের মূল বক্তব্য ছিল চতুর্দশীর দিন ঘরের সব কোণের ধুলো ময়লা পরিষ্কার করে রাখবে নাহলে কুনি ভূত আসবে তোমার ঘরে। গল্প শোনার পর মনে একটা অজানা আশংকা উঁকি দিত। বারান্দা দিয়ে হেঁটে পাশের ঘরে যাবার সময় নির্ঘাৎ কুনি বা বুনির সাথে দেখা হবে। অতএব একা বেড়োনো মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ না ! ঘর থেকে ভাই বোনেরা হাত ধরা ধরি করে বাইরে বেরোতাম। চোখ বন্ধ করে ছুটে চলে যেতাম পাশের ঘরে। ব্যাস আর কুনি বুনির ভয় নেই। বছরের পর অক্লান্ত ভাবে মাসি গল্পটা বলে যেত আর আমরা প্রত্যেকবার সেই একই মুগ্ধতা নিয়ে শুনতাম। গল্প বলার সময় ঘর মোটামুটি অন্ধকার থাকত, চোদ্দো প্রদীপের আলো মাসির মুখে এসে পড়াতে সৃষ্টি হত এক রোমাঞ্চকর পরিবেশের । এখন বেশ বুঝি মাসি খুব উপভোগ করত আমাদের কৌতূহল। ঠোঁটের কোনে থাকতো একটা দুষ্টু হাসি!
এতবছর পর ভাবি সত্যি কি কুনি বুনি ছিল নাকি সেটা ছিল আমাদের সরল মনের বিশ্বাস? ভূত পেত্নী আছে কিনা জানিনা তবে সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো যে নেই তা বেশ বুঝতে পারছি। কালের অন্ধকারে হারিয়ে গেছে আমার অরূপ রতনেরা। কালের নিয়মে হাতের মুঠো কখন আলগা হয়েছে আর যত্নের সেই ফুলঝুরির সোনালী তারারা উধাও হয়েছে । মাসি আর নেই আজ বহুবার বছর তবে আছে শুধু স্মৃতি। সিন্দুকের একেকটা খাপে এক একটি লাল রেশমের কাপড়ে মোরা সেই সব স্মৃতি উৎসবের দিনগুলোতে খুব বেশি মনে কেমন করায়। উৎসবপর্ব শেষ হতেই তালা পড়বে সে সিন্দুকে। নতুন করে সে আবার জায়গা করে নেবে মনের দেরাজে।
আলোর উৎসব সকলের ভালো কাটুক। আমার চোদ্দ প্রদীপের ছবি ...

No comments:
Post a Comment