Thursday, August 8, 2024

|| ধনঞ্জয়ের ফ্রাইড রাইস ||

খুব ছোট বেলায় দূরদর্শনে একটা বাংলা ছবি দেখেছিলাম, প্রখ্যাত চিত্র পরিচালক শ্রী মৃনাল সেন এর "নীল আকাশের নীচে"। তখন মৃনাল সেন কে তা চিনতাম না। তবে যেটা মনে পরে এই ছায়াছবি দেখার পর "চাইনিজ" শব্দটা শিখেছিলাম, চীন বলে একটা দেশ আছে সেটা জেনেছিলাম আর তাদের রকমারি খাবার আছে সেটাও একটু বড়বেলায় টের পেয়েছিলাম। ছায়াছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র এক "চাইনিস" বা "চাইনিজ" ফেরিওয়ালা , রুপোলি পর্দায় সেই ফেরিওয়ালার ভূমিকায় অভিনয় করেন বাঙালির জনপ্রিয় অভিনেতা শ্রী কালী ব্যানার্জী। আমার কাছে কালী ব্যানার্জি আমার জীবনে দেখা প্রথম চাইনিস!

দেশে থাকা কালীন চাইনিজ খাওয়াটা বেশ যুদ্ধ জয়ের পর ট্রফি হাতে নিলে বা পুজোর প্রথম জামাটা বাবা মা র কাছ থেকে পেলে মনটা যেমন হয় ঠিক তেমন একটা বিশেষ আকর্ষণীয় বিষয় ছিল। বাবা ছোটবেলায় শহরের  নামি রেস্টুরেন্টে নিয়ে গিয়ে ইন্দোচাইনিজ খাওয়াতেন। দেশের বাইরে এসে হোমসিক মন সেই ইন্দোচাইনিজ স্বাদ খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে নিজের রান্না ঘরেই সেই স্বাদের জন্ম দিয়ে ফেললো। 


নীল আকাশের নীচে



এহেন ইন্দোচাইনিজ খাবার গল্প ছোটবেলার বিশেষ বিশেষ গল্পের অঙ্গ। ধনঞ্জয়কে সে গল্প বলতেই তার হাতে আবার অন্নপূর্ণার হাতা উঠে এলো, সে তার ছোটবেলার খাওয়া ইন্দোচাইনিজ এর স্বাদ আমাকে বানিয়ে খাওয়াবেই । কলকাতায় চেটে পুটে খাবার পর নিউ ইয়র্কে এসে মাথায় ঘুরতে থাকা সেই ইন্দো চাইনিজের স্বাদ আজ ধনঞ্জয় রপ্ত করে ফেলেছে। এবছরে এই নিয়ে বার দুয়েক এই স্বাদ, গন্ধ রান্নাঘরে ঘোরা ফেরা করেছে, হুবহু সেই গন্ধ , হুবহু সেই স্বাদ। প্রথমবার ছিল বন্ধুদের সাথে পটলাকের জন্য এগ ফ্রাইড রাইস আর দ্বিতীয়বার বাড়িতে হঠাৎ চাইনিজ খাবার ইচ্ছে থেকে এগলেস ভেজিটেবল ফ্রাইড রাইস।  


উপকরণ
 
১. জাসমিন রাইস - ২ কাপ 
২. পেঁয়াজ (সরু লম্বা করে কাটা) - ১ টা বড় 
৩. ম্যাচস্টিক ক্যারোট  - ১ মুঠো 
৪. রঙিন বেল পেপার (সরু লম্বা করে কাটা) - ১ মুঠো 
৫. স্প্রিং ওনিয়ন - ১ মুঠো 
৬. বিন্স  - ১ মুঠো 
৭. ভিনেগার  - স্বাদমতো 
৮. সোয়া সস - স্বাদমতো  
৯. সাদা তেল - ২ থেকে ৩ টেবিল চামচ 
১০. ডিম - ২ টো 
১১. নুন - স্বাদ মত

প্রণালী 

জাসমিন রাইস ৯০% তৈরী করে জল ঝরিয়ে রেখে দিতে হবে।রাইস তৈরী করার সময় নুন দিতে হবে।সাদা তেলে পেঁয়াজ ভেজে নিতে হবে।  এরপর একই  তেলে বিন্স ও তারপর  ম্যাচস্টিক ক্যারোট ভেজে নিতে হবে। পরবর্তীতে রঙিন বেল পেপার দিয়ে ভাজতে হবে। এরপর সোয়া সস দিয়ে ভাজা'গুলো মাখিয়ে নাড়াতে হবে। সোয়া সস ফুটে গেলে তারপর ভিনেগার দিতে হবে। আগে থেকে করে রাখা জাসমিন রাইস অল্প অল্প করে ভাজা মিশ্রণ এর সাথে মিশিয়ে নিতে হবে। পুরোটা মিশে গেলে স্প্রিং ওনিয়ন কুচিয়ে ওপরে ছড়িয়ে পরিবেশন করতে হবে। 

স্বাদ বা ভ্যারাইটির জন্য এম এস জি (আজিনো মোটো) আর বেবি কর্ন ইচ্ছে হলে দেওয়া যেতে পারে। এগ ফ্রায়েড রাইসে ডিম ভেজে মিশিয়ে নিতে হবে। সোয়া সস এ নুনের পরিমাণ খুব বেশি থাকে, তাই জাসমিন রাইস করার সময় নুন দিতে হবে মনোযোগ সহকারে। 

সাথে চিলি ফিশ বা চিলি চিকেন না খেলে এই রাইসকে যথাযথ সম্মান দেখানো হবেনা।  

ধনঞ্জয়ের ফ্রাইড রাইস



Wednesday, August 7, 2024

।।ফ্রোজেন লেক জর্জ।।

ছোটবেলায় বড়পিসির কাছে গল্প শুনতাম আমার পিসতুতো দাদা (আমাদের পরিবারে ভাইবোনদের মধ্যে সব থেকে বড় দাদা) আমেরিকা থেকে জমে যাওয়া মিশিগান লেকের ছবি পাঠাতো। জমে যাওয়া লেক?!! এতো ঠান্ডা যে অত বড়ো সমুদ্রের মতো লেক পর্যন্ত জমে কাঠ , থুড়ি বরফ।  যাকে এদেশে বসে উইন্টার ওয়ান্ডারল্যান্ড ! শুধু এখানেই শেষ না, জমা লেকের ওপর আইস স্কেটিং, গাড়ি চালানো বা স্লেজ গাড়ি টানা এগুলো আবার আমেরিকানদের উইন্টার ভেকেশনের অবশ্য কর্তব্য ! সে ছবিও দাদা বৌদি বড়পিসিকে পাঠিয়েছিল আর আমরা হাঁ করে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। 

জেনারেল নলেজ বইতে পড়েছি ফ্রোজেন লেকের কথা। ছবিও দেখেছি। কিন্তু ছবি দেখে তো আর পুরো ব্যাপারটা ধারণা করা যায়না। ডিসনির ফ্রোজেন ছায়াছবিটা দেখেছিলাম খোদ হলিউডে বসে, এল ক্যাপিটান থিয়েটারে । অ্যানিমেশন দেখে মনে হয়েছিল কম্পিউটার গ্রাফিক্সের মাধ্যমে সহজ রূপকথা, বেশিরভাগটাই কল্পনার। কিন্তু কল্পনার জন্মও বাস্তব থেকেই হয়। 

২০১৮র গোড়ার দিকেই মালুম পেলাম আমাদের গাড়ির ব্যাটারী এবার দেহ রাখবে। নতুন বছরে গাড়িরও ইচ্ছে হয়েছে নতুন কিছু পাবার। বাড়ির আসে পাশে সব দোকানে ব্যাটারী "আউট অফ স্টক " । খোঁজ খবর নিয়ে ছুটে গেলাম বাড়ি থেকে ৪৫ মিনিট ড্রাইভ করে লেক জর্জের কাছে একটি দোকানে যারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো সেই বহুচর্চিত ও বহুমূল্য ব্যাটারী তারা জোগাড় করে দিতে পারবে। পৌঁছনোর ৫ মিনিট আগেই মোবাইলে দোকান থেকে ফোন পেলাম এই মুহূর্তে তাদের কাছে ব্যাটারী নেই। সকালে ছিল , আমরা পৌঁছতে পৌঁছতে শেষ! ভীষন দুঃখ হল , যতটা না আমাদের নিজেদের জন্য তার থেকে অনেক বেশি গাড়িটার জন্য। মন চাঙ্গা করার জন্য ঠিক করলাম লেক জর্জ গেলে কেমন হয়? কাছেই তো, দেরি কেন ?

এই লেক জর্জে আমরা বহুবার গেছি। সামার বা ফলে।  তবে ভয়াবহ ঠান্ডায় কখনোই না। লেক জর্জ নিউ ইয়র্ক স্টেটের অন্যতম দ্রষ্টব্য। একে কুইন অফ আমেরিকান লেক ও বলা হয়। প্রায় ৩৩ মাইল লম্বা এবং প্রায় ৩ মাইল চওড়া , ২১ - ৬০ মিটার মতো গভীর। চারিদিকে আদিরণদাক পাহাড়ে ঘেরা। সামারে স্টিম বোট চলে প্রায় ছোট খাটো জাহাজের মতো। টুরিস্টদের স্নানের ব্যবস্থায় আলাদা বিচ আছে। আবার তাদের পুষ্যি সারমেয়দের জন্য রয়েছে খেলা করার আলাদা বিচ। লেককে কেন্দ্র করে একটি শহর গড়ে উঠেছে। প্রচুর ভালো ভালো খাওয়া দাওয়ার করার ব্যবস্থা। ভালো ভালো কাফে ,বড় বড় রেস্তোরাঁ, থাকার জন্য লেক ফেসিং রিসোর্ট, এছাড়া অমুসমেন্ট পার্ক , হরর হাউস , শপিং মল সব কিছুর ব্যবস্থা আছে। বলা বাহুল্য সামারে উইকেন্ড ট্রিপের জন্য একদম যাকে বলে আইডিয়াল স্পট ! পাশেই প্রসপেক্ট মাউন্টেন।  এর  মাথায় চড়ে যতদূর পর্যন্ত চোখ যায় পাহাড়ে ঘেরা লেক জর্জ। তার সাথে তিনটি স্টেট্ দেখা যায় - নিউ ইয়র্ক, ম্যাসাচুসেটস  আর ভারমোন্ট। বোঝাই যাচ্ছে পিক টুরিস্ট সিসিনে কিরকম ভিড় হতে পারে। প্রসপেক্ট মাউন্টেন এর মাথায় চড়ে লেকের দিকে তাকালেই নৈনিতালের কথা মনে হয়। 

কিন্তু একি ? সেদিনের লেক জর্জ তো একেবারে ফ্রোজেন সিনেমার রূপকথার রাজ্য ! একেবারে বরফে ঢাকা। চারিদিক সাদা। শুধু তাইনা যে লেকে স্টিম বোট চলে সেই লেকে দু চারজন মানুষ স্লেজ গাড়ি নিয়ে হাটছে ! একটি দম্পতি স্নো স্কুটারও  চালাচ্ছে লেকের ওপর। সেদিন নিউ ইয়র্কে রেকর্ড ঠান্ডা। আমাদের চেনা জানা সবাই বাড়ির মধ্যে হয় লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছে না হয় টিভিতে জমাটি মুভি চালিয়ে কফিতে চুমুক দিচ্ছে। আর আমরা দুজন মাইনাস ২৫ ডিগ্রী সেলসিয়াসে বরফের রাজ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খচাখচ ছবি তুলছি। দাদার পাঠানো ছোটবেলার সেই ছবি বা বড়পিসির কাছে শোনা গল্পের সেই ছবির সাথে আমাদের তোলা সে ছবির বিশেষ পার্থক্য কই ?!