Sunday, December 31, 2017

।।শুকনো পোস্ত উপাখ্যান।।

এটা আমার ২০১৭  সালের শেষ পোস্ট। এমন কিছু দিয়ে লেখা শেষ করতে ইচ্ছে করলো যেটা বেশ চোখের সাথে সাথে মনের আরামের ব্যবস্থা করে। যাকে বলে মধুর সমাপ্তি  এই মুহূর্তে আসন্ন অনুয়াল ভ্যাকেশনে দেশে যাবার আনন্দে হার হিম করা বরফে চাপা পড়া গোটা স্কেনেক্টেদী শহরকেও মনে হচ্ছে রূপকথার রাজ্য। যদিও বরফের থেকে বিরক্তিকর জিনিস পৃথিবীতে আর আছে কিনা জানা নেই , তার কারণ প্রধানত কয়েকটি - ১.গৃহবন্দী হওয়া নিশ্চিন্ত  ২.আছাড় খেয়ে পরে হাত পা ভাঙেনি এরকম লোকের দেখা পেলে ভাগ্যবান মনে করবো নিজেকে এবং সেরকম লোকের সাথে কথা হলেই এসময় রাস্তায় বেরোনোটা বেশ চাপের মনে হয়  ৩. ঠান্ডা যে কতটা ভয়ানক হতে পারে একবার বরফের মাঝে দাঁড়ালেই টের পাওয়া যাবে। জোর দিয়ে বলতে পারি বাঙালিদের উইন্টার ওয়াড্রোবের অবিচ্ছেদ অঙ্গ মাংকি টুপিও হার মেনে যাবে এই শীতে। সেখানে মাধুরী দীক্ষিতের পক্ষে শিফন শাড়ি পরে নাচা যে কতটা অবাস্তব তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। তাই এরকম বন্দি দশায় বাড়িতে বসে হয় ভালো ভালো খাবার বানিয়ে খাও, না হয় খাদ্য চর্চা করো, সেইটাই হবে বুদ্ধিমানের  কাজ। 

নন্দিতা-শিবপ্রসাদের ছবি পোস্ত মুক্তি পাবার অন্তত ৭ মাস পর আমার ছবিটা দেখার সুযোগ হয়েছে। ২০১৭র ডিসেম্বরে। ঠাকুরদা ঠাকুমার আদরের নাতির ডাক নাম পোস্ত। সে আবার শান্তিনিকেতনে  ঠাকুরদা ঠাকুমার সাথে থেকে আশ্রমের রীতি নীতি মেনে  বড় হচ্ছে।এযুগের "ইয়ো বেবি" বাঙালি জেনেরেশনের ছেলে মেয়েদের ভালো নাম বা ডাকনাম যেখানে বেশিরভাগই অর্থহীন সেখানে পোস্ত নামটা বেশ আরামদায়ক কানের পক্ষে। শুধু কান কেন? পেট, মাথা এবং রসনার পক্ষে তো বটেই। বাঙালি নামটার সাথে পোস্ত নামটা অঙ্গাঙ্গি ভাবি জড়িত। কাঁচা পোস্ত বেটে ভাতে মেখে খাও বা বাটার মধ্যে আঙ্গুল ডুবিয়ে আঙ্গুল সোজা মুখে চালান করে দিয়ে চেটে খাও, তরকারি বানিয়ে খাও বা বড়া বানিয়ে, গরম ভাতের সাথে বা পান্তা ভাতের সাথে, পোস্ত ইন এনি ফর্ম ইস গডস ফুড। পোস্ত খেতে খেতে মাথার জোট গুলো কেমন যেন ছেড়ে যায়। মনে হয় বহুযুগের জং ধরা তালা গুলো কে যেন চাবি দিয়ে একটু একটু করে খুলতে খুলতে এগোচ্ছে। মাথার ভেতর লেয়ারে লেয়ারে জমে থাকা ঘুমের বাসনা গুলো জেগে উঠছে। শেষ তালা খোলা মাত্রই নীল রঙের রথে চেপে স্বর্গে পৌঁছে পারিজাতের গাছে পা ঝুলিয়ে বসে বেঙ্গমা বেঙ্গমীর গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়া। আমার কথা শুনে মনে হতে পারে আমি হয়তো পোস্ত খেয়ে নেশা টেশা করি। আমাদের এক সাউথ ইন্ডিয়ান কলিগের সেইরকম ধারণা হয়েছিল কলম্বাস এ ইন্ডিয়ান স্টোরে আমাদের হামলে পরে পোস্তর প্যাকেট কেনা দেখে।  কিন্তু সত্যি বলছি যারা রোববার দুপুরে পাঁঠার মাংসের বদলে বিউলির ডালের সাথে আলুপোস্ত মেখে এক থালা ভাত খান তারা আমার কথার তারিফ করবেন আর বলবেন সত্যি তারা পারিজাতের গাছে চড়েন কিনা!

নন্দিতা-শিবপ্রসাদের ছবির প্রেক্ষাপট শান্তিনিকেতন। মনে পড়ল ২০০৮ সালে শান্তিনিকেতনে বেড়াতে গিয়ে পোস্ত খেয়েছিলাম। আশ্রমের ক্যান্টিনে। অকপট স্বীকারোক্তি - জীবনে সেই প্রথম পোস্ত খেতে একটুও ভালো লাগেনি। মনে হয়েছিল গামছা পরে বাটির মধ্যে নেমে সাঁতার কেটে পোস্ত আর আলু খুঁজে বের করতে হবে। ঝোলের প্লাবনে বাতি উপচে পড়ছে কিন্তু পোস্ত নিখোঁজ। আরো কিছু বছর আগে আমাদের নৈনিতাল ভ্রমণে পোস্তর একটা ছোট ভূমিকা ছিল। বাবা সব জায়গার মতো নৈনীতালেও বাঙালি রেস্তোরাঁ খুঁজে বের করেছিলেন - হোটেল মৌচাক। নৈনিতালের শেষদিন  লাঞ্চ মেনুতে হোটেলের ম্যানেজার আমাদের জন্য বিশেষ ফেয়ারওয়েল স্পেশাল পোস্তর ব্যবস্থা করেছিলেন। লুডোর ছক্কার মতো ছোট ছোট করে কাটা আলু, কালোজিরে ফোড়ন দিয়ে সর্ষের তেল দিয়ে বেশ শুকনো শুকনো পোস্ত। বোন পোস্তর বাটিটা পাশে সরিয়ে রেখেছিলো সব শেষে তাড়িয়ে তাড়িয়ে খাবে বলে কিন্তু সেটা আর খাওয়া হয়ে ওঠেনি বেচারির কারণ আমাদের কাঠগোদাম যাবার বাস ছাড়ার টাইম হয়ে গেছিলো আর বাবা এক সেকেন্ডও এক্সট্রা সময় দিতে রাজি ছিলেন না। বাবার সাময়িক সান্ত্বনা শুনে গোমড়া মুখে পোস্তর দিকে আড় চোখ বুলিয়ে বোম মেরে বোন কাঠগোদামের বাসে চেপে বসল। বেড়ানো শেষে কলকাতায় ফিরে মা প্রথম যে রান্নাটা করেছিলেন  সেটা হলো  কালো জীরে ফোড়ন দেওয়া শুকনো শুকনো আলু পোস্ত। যে পোস্ত খেলে নীল রথে চড়ে বেঙ্গমা বেঙ্গমীর গান শুনতে পাওয়া যায় সেই পোস্ত। মৌচাক হোটেলের পোস্ত  না খেতে পাবার শোক তো উধাও হলোই তার সাথে মার্ হাতের পোস্ত আমাদের ফেভারিট ফুড তালিকার একদম ওপরে স্থান করে নিলো। জীবনে অনেক জাতের পোস্ত খেয়েছি যেমন পেঁয়াজ পোস্ত ,আলু ঝিঙে পোস্ত, ডিম পোস্ত, সিম পোস্ত  ,চিচিঙ্গা পোস্ত ,ঢ্যাঁড়স পোস্ত  ,আলু ফুলকপি পোস্ত, বিন্স পোস্ত কিন্তু মার্ হাতের শুকনো আলুপোস্তর ধারে কাছে কোনোটাই পৌঁছয়নি। আমার বড় পিসেমশাই বাঙালদের রান্নার খুব সুখ্যাতি করতেন আর বিশেষ করে তারিফ করতেন মার তৈরী শুকনো আলু পোস্তর। একবার আমাদের বাড়ি এসেছিলেন হঠাৎ করে আগে থেকে খবর না দিয়ে শুধু  সতীর হাতে আলুপোস্ত আর বিউলির ডাল খাবেন বলে। আমার বড়মামা আবার রুটি দিয়ে বেশ উপভোগ করে এই শুকনো পোস্ত। যাদের নাম করলাম তারা প্রত্যেকেই খাদ্য রসিক এবং নিখুঁত ক্রিটিক। তাই আমার মতো চুনোপুঁটির মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন যে শুকনো আলু পোস্তর স্বাদ কেমন! খালি এটুকু জানি আমেরিকায় থেকে প্লেন যখন টেক অফ করে তখন থেকে স্বপ্ন দেখি বাড়ি বসে কখন মার্ হাতের শুকনো পোস্ত উইথ বিউলির ডাল খাবো আর মাথার তালা খুলে নীল রথে চড়বো। 


Thursday, December 28, 2017

।।ধনঞ্জয়ের বেকড স্যামন।।

"বাদল করেছে মেঘের রং ঘন নীল। ঢং ঢং ক’রে ৯টা বাজল। বংশু ছাতা মাথায় কোথায় যাবে? ও যাবে সংসারবাবুর বাসায়। সেখানে কংসবধের অভিনয় হবে। আজ মহারাজ হংসরাজসিংহ আসবেন। কংসবধ অভিনয় তাঁকে দেখাবে। বাংলাদেশে তাঁর বাড়ি নয়। তিনি পাংশুপুরের রাজা। সংসারবাবু তাঁরি সংসারে কাজ করেন। কাংলা,তুই বুঝি সংসারবাবুর বাসায় চলেছিস? সেখানে কংসবধে সং সাজতে হবে। কাংলা, তোর ঝুড়িতে কী? ঝুড়িতে আছে পালং শাক, পিড়িং শাক, ট্যাংরা মাছ, চিংড়ি মাছ।সংসারবাবুর মা চেয়েছেন। " সহজ পাঠ,​দ্বিতীয় ভাগ​,প্রথম পাঠ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ।



নাহঃ আজ বাদল করেনি কিন্তু বরফ পড়েছে। আমেরিকায় মাছের সহজ পাঠ প্রায় চুকে গেছিলো। কিন্তু ধনঞ্জয়ের কল্যাণে মাঝে মাঝে একটু মাছ আধটু জোটে বটে । মাছ রান্নাটা ঠিক আমার হয়না তাই ধনঞ্জয়ের ওপর ভরসা করতেই হয়। বছরের এই সময়টা খুব আনন্দ, একেই চারিদিকে  হ্যাপি হলিডেস শুনে শুনে মনে প্রাণ হলিডেসে সমর্পিত তার মধ্যে প্রবল ঠান্ডা আর তুষারপাতের জন্য মাঝে মাঝে অফিসের অনুমতি নিয়ে সেফটি ফার্স্ট মাথায় রেখে বাড়ি থেকে কাজ করার সুযোগ পাওয়া যায়। এরকম এক দুপুরে  ধনঞ্জয়ের ইচ্ছে হল বেকড স্যামন বানানোর। আমি তখন ইন্টারনেটে সহজপাঠের পাতায় চোখ রেখে সংসারবাবুর মা ট্যাংরা মাছ, চিংড়ি মাছ এর গপ্পো পড়ছি আর রান্নাঘরে তখন ধুন্ধুমার কান্ড। ​

বেকড স্যামন পর্ব নিচে নথিভুক্ত করলাম - ​



  • স্যামন মাছ 
  • পাতি লেবুর রস 
  • গ্রেটেড রসুন 
  • শুরু লম্বা করে কাটা পেয়াঁজ 
  • অনিয়ন পাউডার 
  • গার্লিক পাউডার 
  • ধনেপাতা কুচোনো 
  • লেমন পেপার সিজনিং 
  • অলিভ অয়েল 
  • মিক্সড স্যালাড পাতা 
  • পার্চমেন্ট পেপার

​অনিয়ন পাউডার ,​গার্লিক পাউডার , লেমন পেপার সিজনিং , অলিভ অয়েল  মিশিয়ে পেস্ট বানিয়ে মাছের গায়ে ভালো করে মাখিয়ে এক ঘন্টা রেখে দিতে হবে। পার্চমেন্ট পেপার অর্ধ্যেক ভাজঁ করে মিক্সড স্যালাড পাতা বিছিয়ে নিয়ে তার ওপর মশলা মাখানো মাছ রেখে তারপর কাটা পেঁয়াজ , ​ধনেপাতা কুচোনো ছড়িয়ে দিতে হবে।  এর ওপর লেবুর রস ছড়িয়ে দিতে হবে (সরু চাকা করে কাঁটা লেবু মাছের ওপর বসিয়ে দেওয়া যেতে পারে) ।সবার শেষে হালকা করে অলিভ অয়েল ছড়িয়ে দিতে হবে। এবার পার্চমেন্ট পেপার এর অন্য অংশটা বইয়ের আরেক সাইড এর মতো বন্ধ করে দেখে দিয়ে পাশগুলো মুড়িয়ে একটা খামের মত করে ফেলতে হবে। বেকিং ট্রে তে বসিয়ে ১৮০ ডিগ্রী সেন্ট্রিগ্রেডে এ বেক করতে হবে।  বেক হয়ে গেলে পার্চমেন্ট পেপারের মোড়াক খুলে ৫ মিন গ্রিল করতে হবে। 

বেকড স্যামন তৈরী ! স্যালাডের সাথে শীতের দুপুরে জমলো ভালো। ..






।।ফুটবল ঘুঘনি।।

ঘুঘনি খাবারটা খায়নি এমন বাঙালি হাতে গুণে বলা যাবে। এই মটর বিশিষ্ট 'খাশখাবার' এর কিছু রকমফেরকে কেন্দ্র করে ​একঝাঁক বহুচর্চিত গল্প আগে বলে ফেলি। তারপর না হয় ফুটবল ঘুঘনির বিবরণ দেব।



১. বিজয়ার ঘুঘনি -  এ হল ছোটবেলার বিজয়ার স্মৃতি কারণ আজকের দিনে সেসব পাঠ চুকে গেছে । আগে দশমীর পর আত্মীয়দের বাড়ি ঘুরে ঘুরে বড়দের নমস্কার করতে যাবার পাব্বনি ছিল ঘুগনি । থালা ভর্তি চন্দ্রপুলি, রসগোল্লা, লাডডু, কুচো নিমকি, পেরাকি আর বাটিতে গরম ঘুগনি। ওপরে সদ্য কাটা পেঁয়াজ, কাঁচা লঙ্কা আর ধনেপাতা কুচি। 

২. প্লাটফর্ম ঘুঘনি - লাল রঙের ঝোল, রেলওয়ে প্লাটফর্মের ধারে বিশাল এলুমিনিয়ামের ডেকচিতে রাখা। তলায় কেরোসিনের স্টোভে নিভু নিভু আঁচে গত বেশ কিছু দিন ধরে গরম হচ্ছে। শালপাতার বাটি করে কাঠের চামচ দিয়ে খেতে হবে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত বাঙালি পরিবারে অবশ্যই শেখানো হবে খাওয়া তো দুরস্ত ডেকচির দিকে দেখলেই অন্ধ হয়ে যাবে। তবুও খড়্গপুরের প্লাটফর্মে ট্রেন ঢুকতেই পুরি দিয়ে ঘুগনি খাবার বেলায় ছোটবেলায় শেখা "প্লাটফর্ম ঘুগনি ভীতি" কে গুলি মেরে কোনোদিকে না তাকিয়ে কোপাকপ পুরি দিয়ে ঘুঘনি খাও আর মাঝে মাঝে পায়ের দিকে দু চারটে মশার কামড় খেতে খেতে স্বাদ উপভোগ করে নিজেকে বল ইশ এতদিন কেন এই অমৃতের স্বাদ নিইনি । পরদিন সকালে যে ঘটনাটা অবধারিত ঘটবে সেটা না হয় উহ্য থাক। 

৩. প্যান্ডেল ঘুগনি - পুজোর মাঠের ধুলো মাখা ময়লা হাতে যে ঘুগনি খেতে হয় তাকে বলে প্যান্ডেল ঘুগনি যেটা একা খাওয়া যায়না। পুজো বলে মনটা বেশ উদার থাকে তাই  একটা বাটি থেকে কাঠের চামচ দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে সবাই মিলে খাওয়া যায় প্যান্ডেল ঘুগনি।  আর সেই সবাই যদি কেবল কপোত কপোতি হলে তো কথাই নেই। 

৪. অফিস পাড়ার ঘুগনি -বিকেলের চা আর ম্যানেজারের জ্ঞানের সাথে অফিসের গেটের বাইরের ঘুগনি হলো অফিস পাড়ার ঘুগনি । প্লাটফর্ম ঘুঘনির সাথে বিশেষ তফাৎ নেই তবে ঘুঘনীর বয়স খুব বেশিদিন না কারণ কর্পোরেট এমপ্লয়ীরা মা লক্ষী,তাঁদের বেশি পুরোনো খানা খাওয়ালে ব্যবস্যা লাটে উঠবে। 

৫. ফুটবল ঘুঘনি - নামটা শুনে একটু অবাক  লাগছে তো? এই ঘুগনি হলো "ষ্টার অফ দি শো"। ফুটবল ঘুঘনির জন্মের সময় আমরা অনেক ছোট। কোনো একটা বিশ্বকাপ ফুটবল সিসন চলছে। পরদিন স্কুল আছে বলে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছি। সেদিন বোধহয় মারকাটারি কিছু ম্যাচ ছিল। সম্ভবত সেমিফাইনাল টাইনাল কিছু হবে। রাত দুটো নাগাদ ঘুম ভেঙে গেলো প্রেসার কুকারের সিটিতে। মা খুব চিন্তিত হয়ে বাইরে সরোজমিনে তদন্ত করতে বেড়োলো কারণ ঘটনাটা অপ্রত্যাশিত এবং অসম্ভব ঘটনা। ভাঁড়ারে নিজে হাতে চাবি মেরেছে মা তাই প্রেসার কুকারের সিটি এখন স্বপ্নেই বাজা সম্ভব। তদন্তে  আমরাও  যোগদান করলাম।  দেখা গেল বাবা রান্নাঘরে মহা মনোযোগ সহকারে ঘুঘনি রান্না করছে আর বাবাকে সঙ্গ দিচ্ছে টিভির ফুটবল ম্যাচ । মটর সেদ্ধর শব্দটা এতো জোরে হবে সেটা বাবা আগে থেকে আন্দাজ করেনি সেটা বিলক্ষণ টের পাওয়া গেলো। চমকে গেছি আমরা আর চমকে গেছে বাবা। অবশ্যই এটা ছিল আমাদের জন্য বাবার তরফ থেকে পরদিনের সারপ্রাইস টিফিন। কিন্তু রাট দুটোর সিটি আর সেটা সারপ্রাইস রাখেনি। বাটি চামচ নিয়ে টিভির সামনে একটুও সময় নষ্ট না করে আমরা বসে পড়লাম গরম গরম খাব বলে। ফুটবল ঘুঘনি সেই থেকে আমাদের বাড়ি খুব বিখ্যাত।  বাবা নবদ্বীপ গেলে মুখুজ্যে বাড়ির ফুটবল ঘুঘনি ফ্যানেরা বাটি চামচ হাতে বসে পরে।  এই ঘুগনি বানানোর জন্য বিশেষ দিনক্ষণ পঞ্জিকার প্রয়োজন নেই। যার প্রয়োজন সেগুলো হলো -

সাদা/সর্ষের তেল 
গোটা জিরে 
ধনে গুঁড়ো 
জিরে গুঁড়ো
চানা মশলা 
আদা বাটা 
টমেটো কুচি 
পেঁয়াজ কুচি 
আলু ছোট করে কাটা 
ফুলকপি ছোট করে কাটা 
আন্দাজমতো নুন 
গোলমরিচের গুঁড়ো 




কড়াইতে তেল দিয়ে গোটা জিরে ফোড়ন দিতে হবে। ছোট করে কাটা আলু,ফুলকপি,পেঁয়াজ, টমেটো ভেজে নিতে হবে। ধনে গুঁড়ো, জিরে গুঁড়ো,চানা মশলা,আদা বাটা সাঁতলে নিতে হবে। আগে থেকে ভেজে রাখা সবজির সাথে মেশাতে হবে এই মশলা। সাঁতলানো হলে সেদ্ধ মটর মিশিয়ে দিতে হবে। শেষে নুন আর গোলমরিচের গুঁড়ো মিশিয়ে দিলেই তৈরি ফুটবল ঘুঘনি। 

ঋতুপর্ণর ফার্স্ট পার্সন আর বাবার ফুটবল ঘুঘনি জমিয়ে দিল শীতের সন্ধ্যে।









Tuesday, December 19, 2017

Tibetan Singing Bowl and Secret Santa!

I never knew there exists something called a Tibetan Singing Bowl ! Or wait I should say I have seen it as a child but probably did not have enough knowledge about it.

Yes a Bowl that sings a serene song resonating musical particles to propagate through your neurons.A music which can transport you to the euphoric world of Buddhist monks with the familiar cherubic smiles on their faces.Imagine you are walking down a monastery corridor,you could take a sneak peek of the Buddhist monks wearing bright maroon wrap around shawls and meditating in a vast prayer room with eyes shut and lips murmuring "Om Mani Padme Hum".You could stick your head out of the colorful banisters of the hanging window of the monastery overlooking a lush green valley atop a mountain.Occasionally you could keep on playing the Tibetan Singing Bowl sitting inside a cold monastery chamber surrounded by white marbles and painted walls with a huge golden head of Lord Buddha etched on the wall ... Ah pure bliss! If you would ask me if I have done that, my answer would be yes and no.Yes I have been to several monasteries and no I have not been to Ladakh monastery which I wish I could do some day in my life. 

The monasteries I have been so so far (that I could recollect) are :

1.Monastery near India Nepal border during my first visit to Darjeeling, West Bengal, India when I was in 5th standard in school
2. Monastery in Puri, Orissa, India again while in school 
3. Monastery near Lava, West Bengal, India after I got married
4. Monastery somewhere between Darjeeling and Mirik, West Bengal, India  in the year 2010
5. Monastery near Charkhol,West Bengal, India in 2015
6. Monastery near Kalimpong, West Bengal, India in 2015


Monastery in Leh, Ladkh. PC: Google
Vicki showed a fantastic Buddhist meditating device this morning from her collection and taught me how to produce a soothing resonating sound emerging from the rim of the bowl which lingered across the entire floor.There was a rapid propagation of the magical sound particles along my entire body.The sound was extremely palliative and had a calming effect on my mind. Had been suffering from sever headache over the past few days.Tibetan bowl sang pretty well to me and whispered few words of peace into my ears. 


Here is a picture of the same from internet. 


Tibetan Singing Bowl. PC: Google
 And here goes my gift from secret Santa this year... And guess who could be the Santa? :-) 

Gift from Secret Santa!

Gift from Secret Santa!



Wednesday, December 13, 2017

।।বেসন দিয়ে ফুলকপির তরকারি।।

আমাদের হোয়াটস্যাপ "সেই সময়" গ্রূপ জিন্দাবাদ। চটজলদি খাবার রেসিপি পাবার এর থেকে ভালো জায়গা আর নেই। গ্রূপে মার্ পাঠানো একটা রেসিপি লিখে রাখছি - বেসন দিয়ে ফুলকপির  তরকারি যেটা খুব চটপট করে ফেলা যায় এবং আমি এযাবৎ অন্তত ৪ বার বানিয়ে ফেলেছি। রুটি দিয়ে দারুন খেতে। 

উপকরণ :

১. ছোট ছোট করে কাটা ফুলকপি 
২. ছোট ছোট করে কাটা আলু 
৩. নুন, চিনি, হলুদ, লঙ্কা গুঁড়ো, জিরে গুঁড়ো 
৪. সাদা বা সর্ষের তেল (আমি সর্ষের তেল দিয়েছিলাম)
৫.এক বা দেড় চা চামচ বেসন 
৬.কালো জীরে 
৭. গ্রেট করা টমেটো 

প্রণালী:

কাটা আলু আর ফুলকপি তে বেসন, নুন, চিনি, হলুদ, লঙ্কা গুঁড়ো, জিরে গুঁড়ো মাখিয়ে রেখে দিতে হবে। কড়াইতে তেল গরম হলে কালো জীরে ফোড়ন দিয়ে মশলা মাখানো আলু আর ফুলকপি ছেড়ে দিতে হবে। ওই পাত্রটা  ধুয়ে সামান্য জল কড়াইতে দিতে হবে। ঢাকা দিতে রাখতে হবে সেদ্ধ হয় পর্যন্ত। একটু পর আলু ফুলকপির  পরিমাণ অনুযায়ী গ্রেটেড টমেটো দিয়ে আরো কিছুক্ষণ ঢেকে রাখতে হবে। দুর্দান্ত ছোট জলদি তরকারি। 


Monday, December 11, 2017

।।ক্যাপসিকামের রায়তা।।

আমাদের ইন্ডিকা গাড়ি কেনা হয়েছিল ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। গাড়ির নম্বর 7677. এটা আমাদের প্রথম গাড়ি, স্টিল রঙের । বেহালা থেকে সল্টলেক সেক্টর ফাইভের অফিস যাওয়াটা অনেকটা সহজ হয়ে গেছিল আমাদের দুইবোনের। তবে জার্নিটা খুব লম্বা হত। তাই ফেরার সময় আমরা সপ্তাহে অন্তত দু থেকে তিনদিন অফিস ফেরত কোথাও বেড়াতে চলে যেতাম। আত্মীয় স্বজনের বাড়ি বা মেলা বা শপিং যাওয়া খুব ঘন ঘন সম্ভব হতো ওই গাড়ির জন্য। 

আমাদের সব আত্মীয়দের মধ্যে আম্মার বাড়ি অফিস থেকে সব থেকে কাছে, পিকনিক গার্ডেন,বাইপাস ধরে সোজা রাস্তা। তাই আমরা খুব ঘন ঘন অফিস ফেরত আম্মার কাছে চলে যেতাম। কখনও এক ঘন্টা কখনও দেড় ঘন্টার জন্য। মা মাঝে মাঝে আমাদেরকে ওখানে মিট করত। তারপর পেট পুড়ে হবার খেয়ে বা কোনোদিন টিফিন বক্সে করে খাবার ভরে  বাড়ি আসতাম। গেলেই আম্মা বলতো "ক্ষুধা পাইসে ?" গৌরীদির হাতে তৈরী গরম রুটির সাথে আম্মার তৈরী চিকেন কারিটা  খুব খাওয়া হতো। সাথে থাকতো অবশ্যই  ক্যাপসিকামের রায়তা আর অল্প মিষ্টি আর কিশমিশ দেওয়া দুধের চাচী সমেত সেমাইয়ের পায়েস। তখনো জানতাম না এসব দিনগুলো হাতে গোনা !

গত রোববার ক্যাপসিকামের রায়তা বানিয়েছিলাম। টক দই ফেটিয়ে তাতে কুচি করে কাটা ক্যাপসিকাম আর সামান্য বিটনুন দিয়ে ।  আম্মা ক্যাপসিকাম গুলো পাতলা ফুলের মতো করে কেটে দইয়ে দিয়ে দিত।

রবিবার বাইরে খুব বরফ পড়েছিল। চারিদিক সাদা....ঠিক যেন আম্মার শাড়ির আঁচল !










|| আবদার অলিভার ।।


এতদিন জানতাম আবদার শুধু নিজেদের লোকেদের  সাথেই করা যায়, যেমন বাবা, মা, ঠাকুমা, দিদিমা, দাদু, ঠাকুরদা, দাদা ,দিদি , জামাইবাবু, মাসি , পিসি , খুড়ি, জেঠি, জেঠা , খুড়ো ! দাবিদার হওয়া যায় বোন, ভাই আর হয়তো বরের।  আজ আবদার আর দাবিদারের লিস্ট এ আরেকজন ঢুকে পড়লো। ভিকি, ভিকি জিম টমলিসন । GE তে আমার সহকর্মী।  আমার বন্ধু সংখ্যা খুব কম, হাতে গোনা কয়েকজন। তার অন্যতম কারণ আমার দুই বোন আর আমাদের পরিবারে ঈশ্বরের আশীর্বাদে আমরা অনেক ভাই বোন তাই নতুন করে বন্ধুর প্রয়োজন খুব বেশি হয়নি হাতে গোনা সেই কয়েকজন ছাড়া। 

মাস খানেক আগে একদিন হঠাৎ ইন্টারনেটে ক্রচেটের একটা পেঁচা দেখে খুব শখ হল ওটা আমার চাই। ক্রচেটের কাজ পারিনা। ভিকির ডেস্কে গেলাম যদি শিখিয়ে দেয়। আবদার করলাম - আবদার হল দাবি! সানন্দে আমার দাবি মেনে নিলো ভিকি। 

আজ সোমবার অফিস পৌঁছে ডেস্কে একটা কাটবোর্ড এর সীল করা বাক্স আর  তারপর আমার নাম লেখা আর লাভ সাইন আঁকা। বুঝতে অসুবিধে হোলোনা যে এটা ভিকির কাজ। এক মিনিটও সময় নষ্ট না করে বাক্স খুলে বের করলাম ওলিভার কে। অলিভার কে? অলিভার সেই ক্রোচেটের পেঁচা। 

দাবির আগে আবদার , 
আবদার থেকে অলিভার ! 


Sunday, December 10, 2017

|| যথা পূর্বং তথা পরং ||

মদনমোহন মিষ্টির নামটা প্রথম শুনি ২০০৯ সালে, পুরীর সমুদ্রের ধারে, সমুদ্র স্নান সারার ঠিক পর।পাড়ের দিকে চোখ পড়তেই চির পরিচিত দৃশ্য, বাঁক কাঁধে হাঁড়ি হাঁড়ি মিষ্টি নিয়ে মিষ্টিওয়ালার হাঁক। হাঁড়িতে উঁকি মারতেই জীবনে প্রথম দেখা পেলাম মদনমোহনের। নামের তাৎপৰ্য ঠিক জানা নেই তবে আন্দাজ করছি মিষ্টির আকার অনেকটা শ্রীকৃষ্ণের ছোটোখাটো একটা বাঁশির মত আর তার থেকেই হয়ত মদনমোহন । এবছর পুরীতে গিয়ে বোনের সাথে প্রাতঃভ্রমণে সূর্যোদয়ের পর আবার  সেই মদনমোহনের উদয়, সমুদ্রের ধারে। মাঝে অনেকগুলো বছর কেটে গেছে। কিন্তু মদনমোহনের প্রতি আকর্ষণ যথা পূর্বং তথা পরং। 




ছোটবেলায় ট্রেনে চেপে একবার কোথায় যেন বেড়াতে যাচ্ছি ,হাতে একটা বই উপহার পেয়েছিলাম ছোটমামার থেকে যার মলাটে  একটা রহস্যময় ছবি ছিল। রানী গুন্ডিচা কৌতূহল সামলাতে না পেরে বন্ধ কক্ষের আগল ঠেলে দেখে ফেলেছেন বিশ্বকর্মার কীর্তি। বড়বেলায় শশুরমশাই আরেকটি বই উপহার দিলেন, প্লেনে ওঠার আগে। এবার মলাটে না, সেই রহস্যময় ছবিখানি বইয়ের ভেতরে স্থান করে নিয়েছে। বার বার বইয়ের পাতা উল্টে চোখ যাচ্ছে সেই ছবির দিকে, মন পরে  রানীর গোল গোল চোখের দিকে, অবাক হয়ে কি দেখছে সে ? ট্রেন জার্নি থেকে প্লেন জার্নি করতে মাঝে অনেক বছর। এ'কবছরে ছবির যাত্রা বইয়ের মলাট থেকে ভেতরের পাতায়।তবুও বিশ্বকর্মার অন্ধকার কক্ষের ভেতরের আকর্ষণ সেই যথা পূর্বং তথা পরং। 

এবছর মন্দিরের গর্ভগৃহে ঢোকার সুযোগ হয়নি। সমুদ্রের শব্দ কোনো অজানা কারণে মন্দিরের ভেতরে ঢোকেনা, বা বলা যেতে পারে ঢুকতে দেওয়া হয়না ? তেমনি আরো অনেক কিছুই হতে দেওয়া যেত কিন্তু হতে দেওয়া হয়নি যার বিচার করার আমি কেউ নই। এসব কথা মন্দিরের চাতালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম। পান্ডার উপদেশে ভিড় বাঁচিয়ে সামান্য দূরে গরুর স্তম্ভের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। দেওয়ালে মহাপ্রভুর আঙুলের ছাপে হাত রাখলাম। আজ থেকে বহুবছর আগে এক সৌম্যদর্শন মহাপুরুষ যার প্রেমমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে ভক্তির প্লাবনে গোটা মানবজাতি ভেসে গিয়েছিলো তাঁর হাতের ছাপে হাত রাখতেই ইতিহাস জীবন্ত হয়ে উঠলো। চোখ পড়লো সামনে। মন্দিরের গর্ভগৃহের দরজার এক পাশ থেকে উঁকি দিয়ে তাকিয়ে আছেন জগন্নাথ দেব, বিশাল বড় বড় চোখ করে। সমস্ত জগৎ সংসারকে দেখছেন তার ওই দু চোখ দিয়ে, মহাশূন্যের মত ঘোর কালো তার গায়ের রং ভেদ করে ঠিকরে বেরোচ্ছে এক অপূর্ব জ্যোতি । ঠিক এমনি ভাবেই বড় বড় চোখ করে তিনি গরুর স্তম্ভের দিকে মুখ রেখে মহাপ্রভুকেও দেখতেন একদিন,আবারও সেই যথা পূর্বং তথা পরং। 



Wednesday, December 6, 2017

।।ভূত চতুর্দশী ২০১৭ ।।

       সদ্য দুর্গাপুজো গেছে।  আগেই বলেছি দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়েছি আমেরিকার দূর্গা পুজোতে। ইচ্ছে থাকলেও দেশে পুজোয় যাবার উপায় হয়নি এবার। কালী পুজোতেও জুটলো সেই ঘোল ! সকালে অফিস আর রাতে নস্টালজিয়া এই ছিল আমার ভূত চতুর্দশী ! আজ চোদ্দ প্রদীপ জ্বালাতে জ্বালাতে প্রদীপের শিখা থেকে হাতছানি দিচ্ছিলো  চেনা কিছু  মুখ,চেনা স্মৃতি , চেনা গল্প আর কিছু হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার মানুষের হাসি মুখের মিছিল  । 

       ছোটবেলার ভূত চতুর্দশীর স্মৃতি মানেই মাসির কাছে ভর সন্ধ্যেবেলা ভূতের গপ্পো শোনা ! অলিতে গলিতে তখন কালীপুজোর কালিপটকা দোদোমা তুবড়ি ফাটছে ,পাড়ার সব বাড়ির জানলা বা বারান্দা সেজে উঠেছে তেল বা ঘি এর চোদ্দ প্রদীপ দিয়ে। কেউ কেউ আবার অতি উৎসাহী হয়ে সেই প্রদীপের আলোতেই সদ্য জ্বালানো যত্নের ফুলঝুরির সোনালী তারাগুলি  মুঠো ভোরে জড়ো করছে যেন অন্ধকারে খুঁজে পাওয়া অরূপরতন । আমরা মাসতুতো  ভাই বোনেরা ভাইফোঁটা উপলক্ষে জমায়েত হচ্ছি। মাসিকে ঘিরে বসেছি ভূত চতুর্দশীর গপ্পো শুনবো বলে। গল্পটা ছিল কুনি (ঘরের কোণের পেত্নী ) আর বুনির (বাড়ির বাইরের গাছের পেত্নী ) গল্প।  গল্পে শুরু থেকে শেষ অনেক অন্তমিল ছড়া ছিল যেমন - 

"হ্যাডেলে বামুন হ্যালেঞ্চ ,
কাঠি দিয়ে দাঁত ছলঞ্চ। 
কুনিকে বলবি বুনির ছেলে হয়েছে ".

অপরিষ্কার বামুনকে বুনি ভূতের জানান দেওয়া যে তার ঘরে কুনি ভূত আছে অতএব সত্বর বাড়ি ঘর পরিষ্কার কর নয়তো পেত্নী ঘর মটকে দেবে !
গল্পের মূল বক্তব্য ছিল চতুর্দশীর দিন ঘরের সব কোণের ধুলো ময়লা পরিষ্কার করে রাখবে নাহলে কুনি ভূত আসবে তোমার ঘরে। গল্প শোনার পর মনে একটা অজানা আশংকা উঁকি দিত।  বারান্দা দিয়ে হেঁটে পাশের ঘরে যাবার সময় নির্ঘাৎ কুনি বা বুনির সাথে দেখা হবে। অতএব একা বেড়োনো মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ না ! ঘর থেকে ভাই বোনেরা হাত ধরা ধরি করে বাইরে বেরোতাম। চোখ বন্ধ করে ছুটে চলে যেতাম পাশের ঘরে। ব্যাস আর কুনি বুনির ভয় নেই। বছরের পর অক্লান্ত ভাবে মাসি গল্পটা বলে যেত আর আমরা প্রত্যেকবার সেই একই মুগ্ধতা নিয়ে শুনতাম।  গল্প বলার সময় ঘর মোটামুটি অন্ধকার  থাকত, চোদ্দো প্রদীপের আলো মাসির মুখে এসে পড়াতে সৃষ্টি হত এক রোমাঞ্চকর পরিবেশের । এখন বেশ বুঝি মাসি খুব উপভোগ করত আমাদের কৌতূহল। ঠোঁটের কোনে থাকতো একটা দুষ্টু হাসি! 

এতবছর পর ভাবি সত্যি কি কুনি বুনি ছিল নাকি সেটা ছিল আমাদের সরল মনের বিশ্বাস? ভূত পেত্নী আছে কিনা জানিনা তবে সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো যে নেই তা বেশ বুঝতে পারছি। কালের অন্ধকারে হারিয়ে গেছে আমার অরূপ রতনেরা। কালের নিয়মে হাতের মুঠো কখন আলগা হয়েছে আর যত্নের সেই  ফুলঝুরির সোনালী তারারা উধাও হয়েছে । মাসি আর নেই আজ বহুবার বছর  তবে আছে শুধু স্মৃতি। সিন্দুকের একেকটা খাপে এক একটি লাল রেশমের কাপড়ে মোরা সেই সব স্মৃতি উৎসবের দিনগুলোতে খুব বেশি মনে কেমন করায়। উৎসবপর্ব  শেষ হতেই তালা পড়বে  সে সিন্দুকে। নতুন করে সে আবার জায়গা করে নেবে মনের দেরাজে। 

আলোর উৎসব সকলের ভালো কাটুক। আমার চোদ্দ প্রদীপের ছবি ...


।।শশার শুক্ত ।।

​এযাবৎ জীবনে যতবার শুক্ত ​খেয়েছি, মার হাতে তৈরী শুক্তোর ধারে কাছে কোনোটাই মনে হয়নি। তেতো হলেও এই খাবারটা আমার বড় প্রিয়। ছোটবেলায় নেমন্তন্ন বাড়ি গেলে আর মেনুতে শুক্ত   থাকলে সেই বাড়ি সম্পর্কে একটা অজানা ভা লোবাসা জন্মে যেত আমার।  প্রথমবার  পরিবেশনের পর ক্যাটেরার যখন দ্বিতীয়বার ঝটিকা পরিবেশন করতে এগিয়ে আসতো, লজ্জা পেলেও গোটা কতক বড়ি চেয়ে খেতাম শুক্ত থেকে।

এহেন শুক্ত নিয়ে কিছু মজার ব্যাপার লক্ষ্য করেছি -

১. শুক্ত দিয়ে এক থালা ভাত খেয়ে নেওয়া যায়, তেতো হলেও তা খেতে অমৃত 
২. শুক্ত দুর্দান্ত অপেটাইজার 
৩. আমি লক্ষ্য করেছি যেকোনো বাঙালি  বিয়েবাড়ি বা অনুষ্ঠান বাড়িতে এই পদটা দুপুরের মেনুতে থাকে, রাতের মেনুতে নয়, তার একটা সম্ভাব্য কারণ এটা  ভাত দিয়ে খেতে হয় 
৪. উচ্ছে থাকলেও একটা মিষ্টি স্বাদ থেকেই যায় আগাগোড়া 
৫. শুক্ত কখনো হলুদ হয়না 

 ট্রাডিশনাল শুক্তোর রেসিপি না হয় পরে একদিন লিখবো। আমেরিকায় তো অনেক নতুন নতুন রান্না শিখলাম। এবার একটা নতুন রকমের শুক্ত ট্রাই করলাম। বাড়িতে বেশ কিছু শশা জমে গেছিলো যেগুলো এমনি কেটে বিটনুন দিয়ে খাওয়া ছাড়া আর উপায় মাথায় আসছিলোনা। কোথাও একটা ছবি চোখে পড়লো, শশার শুক্ত। বানিয়ে ফেললাম। তবে শুক্ত নাম হলেও খেতে তেতো না, বরং মিষ্টি! 

বলে ফেলা যাক কিভাবে করেছি শশার শুক্ত।  

উপকরণ :

বড় শশা -২ (আমি ছোট ছোট টুকরো করে কেটেছিলাম , গ্রেট করলে মনে হয় আরো ভালো হবে)
মুগ বড়ি - আমেরিকায় সব ইন্ডিয়ান দোকানে বড়ি পাওয়া  যায়না। ভাগ্য ভালো তাই আলবানী তে পাওয়া গেছে
সর্ষের তেল - আন্দাজমতো  
গোটা শর্ষে - ফোড়ন দিয়েছিলাম 
শর্ষে বাটা - হাফ চা চামচ 
পোস্ত বাটা - এক চা চামচ 
আদা - ছোট ছোট কুচিকুচি করে কাটা 
দুধ - পরিমান মত 
ঘি - ছোট চামচের আধ চামচ এর বেশি খাবার ধৃষ্টতা দেখতে পারিনি 
নুন- আন্দাজ মতো 
চিনি - আন্দাজ মতো  

প্রণালী :

আগে বড়ি ভেজে তুলে নিলাম একটা থালায়। তেল গরম হলে শর্ষে ফোড়ন দিয়ে আদাকুচি সামান্য ভেজে শশা গুলো দিয়ে দিলাম। নুন দিয়ে ঢাকা দিয়ে প্রায় ২০ মিনিট সেদ্ধ করলাম। সেদ্ধ না হলে আবার কিছুক্ষন ঢাকা। জল দেবার প্রয়োজন নেই কারণ শশার জলেই কড়াই ভেসে যাবে। সেদ্ধ পর্ব চুকলে সর্ষে বাটা, পোস্ত দিয়ে ভালো করে ভেজে ফেলা দরকার জলটা কমানোর জন্য। আয়তনে কমে এলে এর মধ্যে ভাজা বড়ি , অল্প দুধ,চিনি আর ঘি দিয়ে নেড়ে ঢেকে রাখলাম মিনিট ৬ এক। ঢাকনা খুলতেই ঘি এর গন্ধে রান্না ঘর ম ম ! দুধ আর সেদ্ধ শশার রস মিশে একটা ক্রিম গ্রেভি তৈরী হয়ে গেলো। গরম ভাত দিয়ে রাতের ডিনারে খেয়ে ফেললাম। 

সত্যজিৎ রায়ের 'সমাপ্তি' ছায়াছবিতে মৃন্ময়ীকে তার (হবু) শাশুড়ি বিয়ের আগে ইন্টারভিউ নেবার সময়  জিজ্ঞাসা করেছিলেন - "শুক্তনিতে  কি ফোড়ন হয়" ? ছেলের পছন্দের কথা শুনে মা প্রায় অক্কা পেয়েছিলেন। প্রথম ধাক্কা সামলে মৃন্ময়ীকে ডেকে তিনি বেশ জরিপ করেছিলেন যে এ মেয়ে তাঁর ছেলের উপযুক্ত কিনা তাই বাঙালী মধ্যবিত্ত গেরস্তের ঘরে শুক্তোর ফোড়ন ছিল পরীক্ষায় ডিস্টিংকশন পেয়ে সফল ভাবে উত্তীর্ণ হবার মাপকাঠি । তবেই বোঝা যায় বাঙালি বাড়িতে শুক্তোর কি সাংঘাতিক ভূমিকা !
"ছেলের পছন্দের কথা শুনে মা প্রায় অক্কা পেলেন সমাপ্তি ছায়াছবির দৃশ্য - ছবি সৌজন্য Google 


প্রথমবার শুনে ভেবেছিলাম শুক্ত শুনেছি, খেয়েওছি  কিন্তু শুক্তনী নামটা তো জানতাম না। পরে জানলাম সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গ যাকে বলে শুক্তনী পূর্ববঙ্গ তাকে  বলে শুক্তা। আর বইয়ে লেখা থাকে শুক্ত।

নিচে রইলো আমার তৈরি  শশার শুক্তর কিছু ছবি। 

Copyright Madhuja Mukhopadhyay

Copyright Madhuja Mukhopadhyay


Sunday, December 3, 2017

।।থ্যাংক্সগিভিং ডিনার ২০১৬।।

​গতবছর থ্যাংক্সগিভিংএ পোর্টল্যান্ড, অরেগনে অন্তুদাদা আর রিংকু বৌদিদের বাড়ি খুব ভালো সময় কাটিয়েছিলাম -আমি,শুভজিৎ,বুগাই, মিশি আর মিস্টার এন্ড মিসেস ব্যানার্জী। থ্যাংক্সগিভিং ছিল ২৪শে নভেম্বর। পুপুর ও যাবার কথা ছিল কিন্তু পুপু কলকাতায় ছুটিতে গিয়ে আটকে গেছিলো,সময় মতো ফিরতে পারেনি।


ঠান্ডা ছিল ভালোই , সুযোগ পেলেই ফায়ারপ্লেসের কাছে ঘুরঘুর করতাম।





ব্যানার্জী দম্পতি দুজনেই অসম্ভব ভালো ভালো রান্না করে খাইয়েছিল আমাদের, রীতিমতো ট্রেডিশনাল থ্যাংক্সগিভিং ডিনার স্টাইলে। আমি টার্কি খাইনা তাই আমার হনরে হোল চিকেন রোস্ট, স্টাফ করা বেল পেপার ,হোল কাউলিফায়ার রোস্ট, ম্যাশ পটেটো, ক্র্যানবেরি চাটনি, ফ্রাইড আস্পারাগাস , প্রন সতে ,পিক্যান পাই , বাকলাভা , আইস ক্রিম ...আর কত কিছু, হাঁপিয়ে গেলাম ।












খেতে বসার আগে যথারীতি আমি ক্যাবলামো করেছিলাম। অত ভালো ভালো খাবার দেখে সবে একটা কিসে হাত দিতে যাবো অমনি অন্তুদা এনাউন্স করলো রাউন্ড দি টেবিল আমরা থাঙ্কস জানাবো। কাকে জানাবো এবং কিসের জন্য জানাবো সেটা বলবো, ইংলিশ বা বাংলায় বলবো আর তারপর খাওয়া দাওয়া শুরু করব। ইশ কি লজ্জা আমি তখন সবে রোস্টেড ফুলকপিতে কাঁটা চামচ গেঁথেছি !! ছিঃ ছিঃ!! যাই হোক কায়দা করে চামচ তা উঠিয়ে নিলাম সঠিক সময়ের অপেক্ষা করে। টেবিল ঘুরে আমার টার্ন এলো অন্তুদা, বুগাই , রিংকু বৌদি , শুভজিতের পর। অনেক ইমোশনাল ডায়ালগ দিলাম, অবশ্যই বাংলাতে। অবশেষে খাবারের পালা। মনে আছে এতো রকমের পদ ছিল যে মাথা গুলিয়ে যাচ্ছিলো কোনটা ছেড়ে কোনটা খাবো। সব টাটকা রান্না সেইদিন ব্যানার্জী দম্পতির করা ।


সকালের জলখাবারের সময় শুভজিতও কড়াইশুঁটির কচুরি বেলার কাজে লেগে পড়েছিল। দুর্দান্ত মাছের চপ ও বানিয়েছিলো বৌদি। 







পরদিন শাহরুখ খানের 'Dear Zindagi' সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম সন্ধ্যেবেলা সবাই মিলে। আর তারপর টুকটাক থ্যাংক্সগিভিং শপিং।

সিনেমা হলে আমরা 

ভাগ্যিস বিদেশে একটা দাদা বৌদি আছে ! পোর্টল্যান্ডএ গেলে এনার্জির সাথে সাথে দিনটাও কেমন বেড়ে যায় !

সজনী সজনী রাধিকালো দেখ অবহুঁ চাহিয়া 

অভিজিৎ আর শুভজিৎ 

পিসি ভাইপো 

আমার  থ্যাংক্সগিভিং ২০১৬র  মিনি ডায়রি আজ এখানে রাখছি। 


।। ছায়ার অ্যালবাম ।।


ভিভালদির Four Seasons শুনছিলাম আজ সন্ধ্যেবেলা। ভায়োলিন কনসার্টকে মাধ্যম করে প্রকৃতির চারটি রূপ যে এমন সুন্দরভাবে সুরের জালে বন্দি করা যায় তা এমন মহান শিল্পীদের কর্মকান্ডের সাথে পরিচিত না হলে অজানা থেকে যেত। Music এ আমার সীমিত জ্ঞান এর সাথে কল্পনা যখন মনের আয়নায় ঘুরে ঘুরে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে আল্পনা আঁকছে,বাজনার তালে তালে দেখতে পেলাম বসন্তের ভোরে কোকিলের একটানা ডাকে গাছের রং কখন পান্না সবুজে পরিণত, কখনও গ্রীষ্মের দারুণ অগ্নিবাণে রিক্ত ধরণীর কঠিন ব্রতপালন, কখনও হেমন্ত ঘন সাদা কুয়াশার চাদর গায়ে জড়িয়ে শস্যক্ষেতে বর্ষশেষে সামিল হচ্ছে কৃষককুলের আনুষ্ঠানিক পর্যায় আবার কখনো বৃদ্ধ শীত ঘোষণা করছে পুরাতনের সাথে নবীনের আলাপচারিতার বিষয়বস্তু । ... Four Seasons শুনছিলাম যখন তখন বাইরে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। আমাদের বারান্দার সামনে একটা প্রকান্ড গাছ। ওই গাছটিকে কেন্দ্র করে প্রকৃতির রূপ পরিবর্তন লক্ষ্য করতে বেশ ভালো লাগে। এই মুহূর্তে হেমন্তলক্ষী ওই গাছটিতে আশ্রয় নিয়েছেন। এ দৃশ্য ভারী পরিচিত, চাকার মতো ঘুরে ঘুরে আসে প্রতি বছর। ঘরের কোণে ভায়োলিনের তালে তালে মোমের শিখার ওঠা নামা দেওয়ালে সৃষ্টি করল রহস্যময় এক মায়াজালের। শব্দ আর আলোর মেলবন্ধনে জালের দৈর্ঘ্য বেড়ে বেড়ে ঘরের সিলিং ছুঁলো। মনে পড়ল ছোটবেলায় বড়পিসীদের বালিগঞ্জের বাড়িতে একবার পিসেমশাই মেমরি গেমের আসর বসিয়েছিলেন। আমরা অনুরোধ করলে "যাও পড়তে বস" শুনতে হতো বাবা কাকাদের কাছে । কিন্তু বড়পিসেমশাই একবার ইচ্ছে প্রকাশ করতেই গোটা মুখুজ্যে বাড়ি হাজির হয়েছিল মেমরি গেমের আসরে যোগ দিতে। সন্ধ্যেবেলায় বসেছিল সেই আসর। লোডশেডিং হয়েছিল তাই ঘরের কোণে বড় বড় মোমবাতি জ্বালানো হয়েছিল। মেমরি গেম পর্ব চলেছিল বহুক্ষণ কারণ কারোর ফাঁকি দেবার হুকুম ছিলনা। শেষ পর্যন্ত থেকে গেছিলাম আমি আর আমার জেঠতুতো দাদা বাকি সবাই আউট ! মোমের আলোয় পরিবারের সবার আশ্চর্য সুন্দর ছায়া পড়ছিল মতিলাল নেহেরু রোডের বিশাল বৈঠকখানার দেওয়ালে । ঠিক যেন দেওয়ালের গায়ে ছায়া দিয়ে ফ্যামিলি অ্যালবাম তৈরী করেছেন আমার পিসেমশাই। বেশ কয়েক রাউন্ড খেলা চলার পর একটা নেশা ধরে গেছিলো, দেওয়ালের ছায়ার দিকে তাকিয়ে গলার আওয়াজ শুনে বুঝতে চেষ্টা করব এটা কার গলা, যেন একটা নীল স্বপ্নের মধ্যে আলো আঁধারিতে নিজের মানুষগুলোকে ছুঁতে পাড়ার সহজ পাঠ নিচ্ছি । এবং হলো ঠিক তাই ,মনে হলো চোখ বন্ধ করলেই সবাইকে চিনতে পারবো। আমার বড়পিসেমশাই মানুষটা ছিলেন খুব সম্ভ্রান্ত। কেমন যেন একটা সাহেব সাহেব ব্যাপার ছিল। অসম্ভব ডিসিপ্লিনড। সবাইকে এক সূত্রে বেঁধে রাখার কি চমৎকার পাঠ পড়েছিলাম সেদিন পিসেমশাই এর কাছে। একটা মেমরি গেমকে কেন্দ্রকরে একটা আলো আঁধারির অরবিটের মধ্যে সবাই সবার পাশাপাশি বসে একে অপরকে মনে দিয়ে শুনছে ও মনে রাখার চেষ্টা করছে প্রানপনে। এ পাঠ তো কোনোদিন ভোলার না। আজকের সন্ধ্যের এই আলো আঁধারির স্বপ্নময় মুহূর্ত আমার খুব চেনা, আজ থেকে কিছু বছর আগের মোমের আলোর নকশার সাথে কি ভীষণ মিল তার। খালি দুঃখ একটাই যিনি সেদিন সহজ পাঠ পড়িয়েছিলেন তিনি চিরবিদায় নিয়েছেন আজ বহুবছর। আজ ভিভালদির সুর আর দেওয়ালে আলোর আল্পনায় নতুন করে জীবন্ত হলেন তিনি।
বরপিসেমশাই ও বড়পিসির ছবিটি আমার মেজো জেঠির সংগ্রহ থেকে।