Sunday, December 10, 2017

|| যথা পূর্বং তথা পরং ||

মদনমোহন মিষ্টির নামটা প্রথম শুনি ২০০৯ সালে, পুরীর সমুদ্রের ধারে, সমুদ্র স্নান সারার ঠিক পর।পাড়ের দিকে চোখ পড়তেই চির পরিচিত দৃশ্য, বাঁক কাঁধে হাঁড়ি হাঁড়ি মিষ্টি নিয়ে মিষ্টিওয়ালার হাঁক। হাঁড়িতে উঁকি মারতেই জীবনে প্রথম দেখা পেলাম মদনমোহনের। নামের তাৎপৰ্য ঠিক জানা নেই তবে আন্দাজ করছি মিষ্টির আকার অনেকটা শ্রীকৃষ্ণের ছোটোখাটো একটা বাঁশির মত আর তার থেকেই হয়ত মদনমোহন । এবছর পুরীতে গিয়ে বোনের সাথে প্রাতঃভ্রমণে সূর্যোদয়ের পর আবার  সেই মদনমোহনের উদয়, সমুদ্রের ধারে। মাঝে অনেকগুলো বছর কেটে গেছে। কিন্তু মদনমোহনের প্রতি আকর্ষণ যথা পূর্বং তথা পরং। 




ছোটবেলায় ট্রেনে চেপে একবার কোথায় যেন বেড়াতে যাচ্ছি ,হাতে একটা বই উপহার পেয়েছিলাম ছোটমামার থেকে যার মলাটে  একটা রহস্যময় ছবি ছিল। রানী গুন্ডিচা কৌতূহল সামলাতে না পেরে বন্ধ কক্ষের আগল ঠেলে দেখে ফেলেছেন বিশ্বকর্মার কীর্তি। বড়বেলায় শশুরমশাই আরেকটি বই উপহার দিলেন, প্লেনে ওঠার আগে। এবার মলাটে না, সেই রহস্যময় ছবিখানি বইয়ের ভেতরে স্থান করে নিয়েছে। বার বার বইয়ের পাতা উল্টে চোখ যাচ্ছে সেই ছবির দিকে, মন পরে  রানীর গোল গোল চোখের দিকে, অবাক হয়ে কি দেখছে সে ? ট্রেন জার্নি থেকে প্লেন জার্নি করতে মাঝে অনেক বছর। এ'কবছরে ছবির যাত্রা বইয়ের মলাট থেকে ভেতরের পাতায়।তবুও বিশ্বকর্মার অন্ধকার কক্ষের ভেতরের আকর্ষণ সেই যথা পূর্বং তথা পরং। 

এবছর মন্দিরের গর্ভগৃহে ঢোকার সুযোগ হয়নি। সমুদ্রের শব্দ কোনো অজানা কারণে মন্দিরের ভেতরে ঢোকেনা, বা বলা যেতে পারে ঢুকতে দেওয়া হয়না ? তেমনি আরো অনেক কিছুই হতে দেওয়া যেত কিন্তু হতে দেওয়া হয়নি যার বিচার করার আমি কেউ নই। এসব কথা মন্দিরের চাতালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম। পান্ডার উপদেশে ভিড় বাঁচিয়ে সামান্য দূরে গরুর স্তম্ভের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। দেওয়ালে মহাপ্রভুর আঙুলের ছাপে হাত রাখলাম। আজ থেকে বহুবছর আগে এক সৌম্যদর্শন মহাপুরুষ যার প্রেমমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে ভক্তির প্লাবনে গোটা মানবজাতি ভেসে গিয়েছিলো তাঁর হাতের ছাপে হাত রাখতেই ইতিহাস জীবন্ত হয়ে উঠলো। চোখ পড়লো সামনে। মন্দিরের গর্ভগৃহের দরজার এক পাশ থেকে উঁকি দিয়ে তাকিয়ে আছেন জগন্নাথ দেব, বিশাল বড় বড় চোখ করে। সমস্ত জগৎ সংসারকে দেখছেন তার ওই দু চোখ দিয়ে, মহাশূন্যের মত ঘোর কালো তার গায়ের রং ভেদ করে ঠিকরে বেরোচ্ছে এক অপূর্ব জ্যোতি । ঠিক এমনি ভাবেই বড় বড় চোখ করে তিনি গরুর স্তম্ভের দিকে মুখ রেখে মহাপ্রভুকেও দেখতেন একদিন,আবারও সেই যথা পূর্বং তথা পরং। 



No comments:

Post a Comment