আম্মা যেদিন চলে গেল সেদিন দেশে ২৬শে জানুয়ারী,আমাদের এখানে তখনও ২৫ সন্ধ্যেবেলা। অফিস থেকে ফিরে আমি আর শুভজিৎ Albany Hindu মন্দিরে আম্মার জন্য পূজো দিতে গেছিলাম এই প্রার্থনা করে যে আম্মা যেন তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে নার্সিং হোম থেকে বাড়ী ফিরে যায়। আম্মা তো বাড়ি ফিরল না কিন্তু আমরা বাড়ি ফিরে যখন খবরটা পেলাম তখন মনে হলো ঈশ্বরের কাছ থেকে সপাটে গালে একটা থাপ্পর খেলাম ! এও মনে হলো মন্দিরে কি প্রহশন করতে গেছিলাম ?! এই নিয়ে অনেকে অনেক প্রকার মতামত প্রকাশ করতে পারেন তাই আর যুক্তি তক্ক গপ্পোর মধ্যে গেলাম না। তারপর থেকে এদেশে আর মন্দির যাবার প্রযোজন বোধ করিনি ।
আমার একা থাকার দ্বিতীয় weekend এর দ্বিতীয় দিন আজ। লিখতে বসেছি কি কি করলাম উল্লেখ যোগ্য আজকের দিনটিতে । একা থাকার ভালো খারাপ নিয়ে পুপুর সাথে বিস্তর আলোচনা হযেছে গত সপ্তাহে বেশ কয়েকবার। তবে মূল কথা হল একা থাকা বেশ মজার ব্যাপার। ফিরে আসি আজকের কথায়। আজকের প্রধান কাজ বলব ঘড়ির সময় বদলানো ! কাল রাত ২টো থেকে আমাদের ঘড়ি আবার এক ঘন্টা এগিয়ে গেছে তাই তার সাথে তাল মিলিয়ে ঘড়ি বাবু সাজাই আজকের প্রধান কাজ হওয়া উচিৎ। পরবর্তী আকর্ষণ বলব Albany গুরুদ্বারা তে যাওয়া। এর আগেও একবার গেছি শুভজিৎ আর আমি। আমারই জুনিয়র কলিগ ও তার বর আমাকে আজ আবার জোর করে ধরে নিয়ে গেল। ওরা Sindhi, মাঝে মাঝেই গুরুদ্বারায় যায়। বাড়িতে বসে বেজায় বোর হচ্ছিলাম তাই রাজী হয়ে গেলাম।
যাবার আগে ফোনে বাবা ও মা দুজনেই শুনে বলল ওদের প্রসাদ হালুয়াটা বড় ভালো খেতে হয়, ওটা মিস করিস না । আমি আজ এতটুকু সুযোগের অপব্যবহার না করে গ্রান্থসাহিব পাঠ,গুরবানী কীর্তনের পর ভক্তি সহকারে ঘিয়ে চোবানো হালুয়া খেয়ে নিলাম বেশ খানিকটা।আগের দিন লজ্জা করে না খেয়ে বেশ মিস করেছি বুঝলাম। গুরুদ্বারার সিলিঙে স্কাই লাইট দিয়ে ঝলমলে রোদ্দুর ঢুকছে উপাসনা ঘরের ভেতরে।আমার চোখ বার বার সেই আলোর দিকে যাচ্ছে। উপাসনা ঘরের এক কোনে মঞ্চ করে যে সময় গুরবানী বা কীর্তন হচ্ছিল সেই সময়ে ( ভাষা বুঝতে পারছিলাম না বলেই হয়ত) ছোটবেলার একটা ঘটনা মনে পরে গেল। হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার আগে বাবা আমাকে দিল্লি বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিল। সাথে অবশ্যই মা আর RJ (রুমঝুম) ছিল। দিল্লি থেকে বাবা অপসন দিল আগ্রা যাবে না অমৃতসরের গোল্ডেন টেম্পল। আমি ছাড়া সবার ইচ্ছে ছিল গোল্ডেন টেম্পল। কিন্তু আমি ছোট থেকেই যাকে বলে আদরে বাঁদর ! তাই সেই আগ্রাই যাওয়া হলো এর আগে বহুবার আগ্রা ঘোরা স্বত্তেও ! নেট রেসাল্ট দাঁড়ালো আমার একগুয়েমির জন্য বাবার গোল্ডেন টেমপ্ল ঘোরা হলো না।স্কাই লাইটের আলোর সাংঘাতিক ক্ষমতা! কিরকম গিল্ট ফিলিং করিয়ে ছাড়লে! কানের মধ্যে তখন বাজছে "বাহে গুরুজী কা খালসা বাহে গুরুজী কী ফাতেহ ",পরম ভক্তিভরে মহিলারা একদিকে আর পুরুষরা আরেক দিকে চোখ বন্ধ করে কীর্তনিয়ার সাথে গলা মিলিয়েছে। আমিও মাথায় ঘোমটা দিয়ে তাদের ধর্মীয় চিন্তাধারাকে সম্মান জানিয়ে মহিলাদের দলে ভিড়ে গেছি। শিখ কমুনিটি এখানে যাকে বলে বেশ স্ট্রং। দেশের জন্য এদেশ থেকে উপার্জন করা টাকা পাঠিয়ে এরা অনেক rehabilitation centre খুলেছে পাঞ্জাবে। আরো অনেক কাজ করতে চায় সমাজের জন্য। আমি জানতাম কানাডায় পাঞ্জাবীদের পপুলেশন বেশি। এখন দেখছি নিউ ইরকের ক্যাপিটাল Albany তেও এদের বিশাল প্রতিপত্তি। ওখানে বসে মনে হচ্ছিল পাঞ্জাবে বসে আছি।কারোর সাথে চোখাচোখি হলেই "ও কায়েসে হো জী "! যেন আমি কতদিনের চেনা। খুব ভালো সময় কাটালাম বলার অপেক্ষা রাখেনা।
এরপর ছিল লঙ্গর ,আমি অবশ্য তাতে খেতে যেতে পারিনি কারণ সত্যটি হলো অতখানি ঘি খাবার পর আর তিল ধরণের জায়গা ছিলনা । তবে খেদ নেই, এই গুরুদ্বারাতেই আমরা লঙ্গরে ভুঁড়ি ভোজ করে গেছি। বাইরে বেড়িয়ে যে সময় সবাই খেতে ব্যাস্ত সেই সময় বেশ কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম। আর ফোনে অন্তুদাদা আর রিঙ্কু বৌদিকে শুভজিতের এযাবৎ জার্মানি ঘোরার গপ্প শোনালাম ! ওখানেই আগামী বছরের প্লান ফেললাম অন্তুদাদা আর রিঙ্কু বৌদি কে নিয়ে আমরা এই চত্বরে কোথায় কোথায় বেড়াব! এই হলো আমার আজকের গুরুদ্বারা ঘোরার গপ্প।
এবেলা বলে রাখি আমাদের Whatsapp এর Colonial Cousins গ্রুপ ক্রমশই ভীষণ ভাবে কলোনিয়াল হয়ে উঠেছে।আজ সকালে পাল্লা দিয়ে FCD (ফুচুদাদা) নিউজিলণ্ড আর শুভজিৎ জার্মানি ছবি ,ভিডিও আর গপ্পে মন তরতাজা করে দিয়েছে। সব থেকে ইন্টারেষ্টিং হল ওদের গপ্প সবই লাইভ কমেন্ট্রি আমার মত রাত জেগে মাথা চুলকিয়ে হাই তুলে চোখের জল মুছে লেখা না !
রাতে আমার দিনোলিপি লিখতে বসে Rang De Basanti ছবিতে শিখ মূলমন্ত্র "এক ওঙ্কার সাথ নাম" শুনে ফেললাম আর রবিঠাকুরের বন্দী বীর কবিতাটা আবার পড়ে ফেললাম। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে কিছু চেয়ে নেবার মানসিকতা এই মুহুর্তে আমার নেই। আপাতত ভাগ্যের ওপর ছাড়লাম বাবার গোল্ডেন টেম্পল যাবার ইচ্ছেপুরণ।
ও হ্যা !সন্ধ্যেবেলা আমাদের কম্যুনিটির ছেলেটা আবার জাগলিং প্রাকটিস করতে এসেছিল। তারও একখানা ছবি দিলাম। বেশ মনে হচ্ছিল আমিও কোনো অর্দৃশ্য শক্তির হাতে জাগলিং প্রাকটিসের একটা বল ! তা নাহলে ২৫শে জানুরারির পর পণ করেছিলাম মন্দিরে যাবনা সেই আমি ঢুকে পরলাম গুরুদ্বারাতে আর আবার নতুন করে মাথায় ঢুকলো গোল্ডেন টেম্পল যাবার কি হবে! একেই বলে "নাই লজ্জা যাহার "।




No comments:
Post a Comment