প্রতি বছরের মত এবছরেও অফিসে আমার এক সহকর্মী স্বভাব বশত তার গাছে ফোটা একখানি পেওনি ফুল কোনো এক গ্রীষ্মকালের শুরুর দিকের সকালে আমার ডেস্কে রেখে গেছিল। ডেস্ক আলো করে যেমন তার উজ্জ্বল গোলাপি রং তেমনি সুন্দর হালকা মিষ্টি গন্ধ। সেই গন্ধে মাতোয়ারা আমি, আমার ডেস্ক, আমার ল্যাপটপ আর আমার সব ইন্দ্রিয় ! বেলা বাড়তেই দেখলাম হালকা গোলাপি রঙখানি গাঢ় গোলাপিতে পরিণত হচ্ছে। আমার প্রলাপের সাথে যাদের পরিচয় আছে তারা এতদিনে জেনে গেছেন আমি ম্যাজিক শব্দ "নস্টালজিয়া"র ওপর ভর করে মার্কিনযুক্তরাষ্ট্রে দিনগত পাপক্ষয় করছি ! ওই নস্টালজিয়াই রোজ সকালে মনে করায় আমি দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে। পেওনির গন্ধে তখন কাজ আর চোখ দুই কপালে উঠলো ! আমার পাঁচ ইন্দ্রিয়ের অবিচ্ছেদ্য চোখ ও নাক গাঁটছড়া বাঁধলো আমার শৈশবের স্মৃতির সাথে। স্মৃতির ডানায় ভর করে পৌঁছলাম আমার দেশের বাড়ি।
আমার দেশের বাড়ি নবদ্বীপে। বাড়িতে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে বাগানের রানী ছিল এক বিশাল স্থলপদ্ম গাছ। ছিল বলছি কারণ কালের নিয়মে ও বন্যার দাপটে সেই রানী আজ মুখার্জী বাড়ির ইতিহাসে স্থান করেছে। আমরা সবাই আছি, আছে আমাদের বাড়ি, কিন্তু পদ্মগাছ আর নেই। বাড়ির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ সেই স্থলপদ্ম গাছ যার গল্প আজও পাড়ার লোকের মুখে মুখে ফেরে । দিনে ৫০-৭০ টা পর্যন্ত ফুল ফুটতে দেখেছি আমরা সেই গাছে ,কখনো আরো বেশি !! কি তার আয়তন! কি তার শোভা ! কাকিমার রোজ ভোরের কাজ ছিল সেই ফুলের যেন কোনো অযত্ন না হয় তার দিকে লক্ষ্য রাখা। বাড়ির নিত্য পুজোর জন্য রোজ লগা দিয়ে ফুল পাড়া হত । এক অদ্ভত অজানা রহস্য লুকোনো থাকে স্থলপদ্মফুলের ভেতরে । ভোরবেলার রং দুধ সাদা,বেলা বাড়তেই সেই ফুল হালকা গোলাপি, দুপুরে গাঢ় গোলাপি আর সন্ধ্যেবেলা লাল ! কাকা স্নান পর্ব সেরে সারা বাড়ি, ঠাকুরঘর, দালান ঘুরে ঘুরে ঠাকুমা ঠাকুরদা এবং সব ঠাকুর দেবতাকে সদ্য ফোঁটা সাদা স্থলপদ্ম ফুল দিয়ে সাজাতেন। সন্ধ্যেবেলা কাকিমার শাঁখের আওয়াজ আর ঘরের কোনের ধুপ ধুনোর গন্ধে আমরা যখন কপালে হাত ছোঁয়াচ্ছি তখন সাদা স্থলপদ্ম গুলো গোধূলির আকাশ থেকে একরাশ গাঢ় লাল রং মেখে পূর্ণতা পেয়েছে। আর আমরা অবাক হয়ে তা দেখেছি। দৃঢ় ধারণা ছিল কাকা কাকিমার কাছে রূপকথার যাদুকাঠি আছে,তার ছোঁয়ায় ফুলের রং বদলে যেতে পারে, আমরা গোটা পরিবার এক সূত্রে বাঁধা পড়তে পারি আমাদের দেশের বাড়িতে, ঠিক যেন সেই স্থলপদ্ম দিয়ে গাঁথা একটি মালা, আর সেই যাদুকাঠি ভোরের রুপোলি আলোকে বদলে দিতে পারে সাঁঝবাতির খাঁটি সোনা রঙের আলোয় !
গত সপ্তাহে এই দিনে নবদ্বীপে মুখুজ্যে বাড়িতে চাঁদের হাট বসেছিলো রাশ পূর্ণিমা উপলক্ষে। নিয়মমতো সকালের পুজো সেরেছে কাকা,সন্ধ্যেবেলা গেরস্তের মঙ্গল কামনা করে শাঁখে ফুঁ দিয়েছে কাকিমা। ঘরে জ্বলেছে সন্ধ্যা প্রদীপ। আর আমি মানসচক্ষে তা দেখেছি নিউ ইয়র্কে বসে। আর পেয়েছি সেই দুই যাদুকরের উষ্ণ ছোঁওয়া। ছবিটি আমার কাকার পুজো করার সময় আমার তোলা কিছুবছর আগে।
No comments:
Post a Comment