ছোটবেলায় বড়পিসির কাছে গল্প শুনতাম আমার পিসতুতো দাদা (আমাদের পরিবারে ভাইবোনদের মধ্যে সব থেকে বড় দাদা) আমেরিকা থেকে জমে যাওয়া মিশিগান লেকের ছবি পাঠাতো। জমে যাওয়া লেক?!! এতো ঠান্ডা যে অত বড়ো সমুদ্রের মতো লেক পর্যন্ত জমে কাঠ , থুড়ি বরফ। যাকে এদেশে বসে উইন্টার ওয়ান্ডারল্যান্ড ! শুধু এখানেই শেষ না, জমা লেকের ওপর আইস স্কেটিং, গাড়ি চালানো বা স্লেজ গাড়ি টানা এগুলো আবার আমেরিকানদের উইন্টার ভেকেশনের অবশ্য কর্তব্য ! সে ছবিও দাদা বৌদি বড়পিসিকে পাঠিয়েছিল আর আমরা হাঁ করে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম।
জেনারেল নলেজ বইতে পড়েছি ফ্রোজেন লেকের কথা। ছবিও দেখেছি। কিন্তু ছবি দেখে তো আর পুরো ব্যাপারটা ধারণা করা যায়না। ডিসনির ফ্রোজেন ছায়াছবিটা দেখেছিলাম খোদ হলিউডে বসে, এল ক্যাপিটান থিয়েটারে । অ্যানিমেশন দেখে মনে হয়েছিল কম্পিউটার গ্রাফিক্সের মাধ্যমে সহজ রূপকথা, বেশিরভাগটাই কল্পনার। কিন্তু কল্পনার জন্মও বাস্তব থেকেই হয়।
২০১৮র গোড়ার দিকেই মালুম পেলাম আমাদের গাড়ির ব্যাটারী এবার দেহ রাখবে। নতুন বছরে গাড়িরও ইচ্ছে হয়েছে নতুন কিছু পাবার। বাড়ির আসে পাশে সব দোকানে ব্যাটারী "আউট অফ স্টক " । খোঁজ খবর নিয়ে ছুটে গেলাম বাড়ি থেকে ৪৫ মিনিট ড্রাইভ করে লেক জর্জের কাছে একটি দোকানে যারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো সেই বহুচর্চিত ও বহুমূল্য ব্যাটারী তারা জোগাড় করে দিতে পারবে। পৌঁছনোর ৫ মিনিট আগেই মোবাইলে দোকান থেকে ফোন পেলাম এই মুহূর্তে তাদের কাছে ব্যাটারী নেই। সকালে ছিল , আমরা পৌঁছতে পৌঁছতে শেষ! ভীষন দুঃখ হল , যতটা না আমাদের নিজেদের জন্য তার থেকে অনেক বেশি গাড়িটার জন্য। মন চাঙ্গা করার জন্য ঠিক করলাম লেক জর্জ গেলে কেমন হয়? কাছেই তো, দেরি কেন ?
এই লেক জর্জে আমরা বহুবার গেছি। সামার বা ফলে। তবে ভয়াবহ ঠান্ডায় কখনোই না। লেক জর্জ নিউ ইয়র্ক স্টেটের অন্যতম দ্রষ্টব্য। একে কুইন অফ আমেরিকান লেক ও বলা হয়। প্রায় ৩৩ মাইল লম্বা এবং প্রায় ৩ মাইল চওড়া , ২১ - ৬০ মিটার মতো গভীর। চারিদিকে আদিরণদাক পাহাড়ে ঘেরা। সামারে স্টিম বোট চলে প্রায় ছোট খাটো জাহাজের মতো। টুরিস্টদের স্নানের ব্যবস্থায় আলাদা বিচ আছে। আবার তাদের পুষ্যি সারমেয়দের জন্য রয়েছে খেলা করার আলাদা বিচ। লেককে কেন্দ্র করে একটি শহর গড়ে উঠেছে। প্রচুর ভালো ভালো খাওয়া দাওয়ার করার ব্যবস্থা। ভালো ভালো কাফে ,বড় বড় রেস্তোরাঁ, থাকার জন্য লেক ফেসিং রিসোর্ট, এছাড়া অমুসমেন্ট পার্ক , হরর হাউস , শপিং মল সব কিছুর ব্যবস্থা আছে। বলা বাহুল্য সামারে উইকেন্ড ট্রিপের জন্য একদম যাকে বলে আইডিয়াল স্পট ! পাশেই প্রসপেক্ট মাউন্টেন। এর মাথায় চড়ে যতদূর পর্যন্ত চোখ যায় পাহাড়ে ঘেরা লেক জর্জ। তার সাথে তিনটি স্টেট্ দেখা যায় - নিউ ইয়র্ক, ম্যাসাচুসেটস আর ভারমোন্ট। বোঝাই যাচ্ছে পিক টুরিস্ট সিসিনে কিরকম ভিড় হতে পারে। প্রসপেক্ট মাউন্টেন এর মাথায় চড়ে লেকের দিকে তাকালেই নৈনিতালের কথা মনে হয়।
কিন্তু একি ? সেদিনের লেক জর্জ তো একেবারে ফ্রোজেন সিনেমার রূপকথার রাজ্য ! একেবারে বরফে ঢাকা। চারিদিক সাদা। শুধু তাইনা যে লেকে স্টিম বোট চলে সেই লেকে দু চারজন মানুষ স্লেজ গাড়ি নিয়ে হাটছে ! একটি দম্পতি স্নো স্কুটারও চালাচ্ছে লেকের ওপর। সেদিন নিউ ইয়র্কে রেকর্ড ঠান্ডা। আমাদের চেনা জানা সবাই বাড়ির মধ্যে হয় লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছে না হয় টিভিতে জমাটি মুভি চালিয়ে কফিতে চুমুক দিচ্ছে। আর আমরা দুজন মাইনাস ২৫ ডিগ্রী সেলসিয়াসে বরফের রাজ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খচাখচ ছবি তুলছি। দাদার পাঠানো ছোটবেলার সেই ছবি বা বড়পিসির কাছে শোনা গল্পের সেই ছবির সাথে আমাদের তোলা সে ছবির বিশেষ পার্থক্য কই ?!
No comments:
Post a Comment